.jpg.webp)
ঐতিহাসিক বিজয়ের ভাষণে ইসরায়েলের বর্ণবাদী ব্যবস্থা ও গণহত্যামূলক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের করের অর্থ ব্যয়ের বিরোধিতা করে আবারও বক্তব্য দিয়েছেন মিসরীয় বংশোদ্ভূত ও ডেমোক্র্যাট দলের প্রগতিশীল অংশের নেতা আব্দুল এল-সায়েদ, চলমান মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প ও ইসরায়েলি লবিস্টদের তুমুল বিরোধিতা সত্ত্বেও মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন।
বুধবারের এই জয়ের মধ্য দিয়ে আগামী জানুয়ারি থেকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
৮০ শতাংশ ভোট গণনা শেষ হওয়ার পরই নিজের বিজয় ঘোষণা করেন এল-সায়েদ। তখন তাঁর প্রাপ্ত ভোট ছিল ৫১ দশমিক ৮ শতাংশ। অন্যদিকে, তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্স পেয়েছিলেন ৪৬ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে বেশ ভালো ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) স্থানীয় সময় বুধবার রাত ২টা ২৭ মিনিটে (জিএমটি সময় সকাল ৭টা ২৭ মিনিট) এল-সায়েদকে বিজয়ী ঘোষণা করে।
বিজয় উদ্যাপনের অনুষ্ঠানে উচ্ছ্বসিত সমর্থকদের সামনে দেওয়া বক্তব্যে এল-সায়েদ বলেন, ‘আপনাদের নির্বাচিত সিনেটর হিসেবে এখানে দাঁড়াতে পেরে আমি অত্যন্ত গর্বিত ও সম্মানিত বোধ করছি।’
বক্তব্যে তিনি জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের করা ইসলামবিদ্বেষী ও অপমানজনক মন্তব্য সত্ত্বেও তিনি নির্বাচনে জয়ী হতে পেরেছেন।
সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘যেসব মা-বাবাকে তাঁদের সন্তানদের বোঝাতে হয়েছে, প্রেসিডেন্ট কেন প্রকাশ্যে কারও নাম কিংবা ধর্মীয় উপাসনার পদ্ধতি নিয়ে ঠাট্টা করতে পারেন, তাঁদের বলুন, আগামীকাল যেন তাঁরা সন্তানদের জানিয়ে দেন—খারাপ লোকেরা হেরে গেছে।’
এ সময় উপস্থিত সমর্থকেরা করতালি দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানান।
তিনি আরও বলেন, ‘তারা এমন একটি আমেরিকা চায়, যেখানে আমাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজেদের জায়গা পাবে না। কিন্তু আমরা জানি, আমেরিকা আমাদের সবার জন্যই যথেষ্ট বড়।’
হাসিমুখে সমর্থকদের করতালির জবাব দেওয়ার পাশাপাশি নিজের বক্তব্যে বিশেষভাবে ভ্যান্স ও ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে কথা বলেন এল-সায়েদ।
ভ্যান্সকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘জেডি, হাবিবি, এখানে বেশ মজার একটা ব্যাপার আছে। আগামী জানুয়ারিতে সংবিধান অনুযায়ী তোমাকেই আমাকে শপথ পড়াতে হবে।’
এরপর ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘ডোনাল্ড, আমি জানি, আমার নাম উচ্চারণ করতে তোমার সমস্যা হয়। তাই আগামী জানুয়ারিতে জেডি আমাকে শপথ পড়ানোর পর তুমি চাইলে শুধু সিনেটর বলেই আমাকে ডাকতে পারো।’
এল-সায়েদের এই বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
‘আমরা চাই না, আমাদের করের টাকা বর্ণবাদী ব্যবস্থা কিংবা গণহত্যামূলক যুদ্ধ চালানোর কাজে ব্যয় করা হোক।’—আবদুল এল-সায়েদ
অগাস্টে অনুষ্ঠিত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে দলের প্রভাবশালী নেতাদের হিসাব-নিকাশ ও সমর্থনকে চ্যালেঞ্জ করে অল্প ব্যবধানে হেইলি স্টিভেন্সকে হারিয়েছিলেন এল-সায়েদ। স্টিভেন্সের পক্ষে ছিল ইসরায়েলপন্থী লবিগোষ্ঠীগুলোর সমর্থন। এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছিল। ওই নির্বাচনে জয়ের পরপরই সিনেটে প্রগতিশীল রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এল-সায়েদকে সমর্থন জানান।
নিজের নির্বাচনী প্রচারে আমেরিকান ইসরায়েল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপ্যাক) এবং অন্যান্য ইসরায়েলপন্থী লবিগোষ্ঠীর ভূমিকারও কঠোর সমালোচনা করেন তিনি। এসব সংগঠন তাঁর বিরুদ্ধে কয়েক কোটি ডলার ব্যয় করেছিল।
এআইপ্যাকের উদ্দেশে এল-সায়েদ বলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার খরচ করার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আপনাদের দুবার হারানোর সুযোগ করে দিয়েছেন আপনারাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফিলিস্তিনি শিশুরা যেন নিজেদের পূর্বপুরুষদের ভূমিতে বড় হওয়ার সুযোগ পায় এবং আমাদের করের টাকায় তাদের হত্যা করা না হয়—এমনটা বিশ্বাস করলে তারা আপনাকে ঘৃণাকারী বলে আখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে।’
এরপর তিনি বলেন, ‘আপনি যদি সমান অধিকার, শান্তি, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারে বিশ্বাস করেন, তাহলে সেটি ঘৃণা নয়, ভালোবাসা।’
নিজের করের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা উচিত, সে বিষয়ে এল-সায়েদ বলেন, ‘আমরা চাই, আমাদের করের টাকা দেশের মানুষের প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হোক। আমরা চাই না, সেই অর্থ বর্ণবাদী ব্যবস্থা কিংবা গণহত্যামূলক যুদ্ধ চালানোর জন্য পাঠানো হোক।’
মিশিগান ডেমোক্র্যাটিক পার্টির তৎকালীন চেয়ারম্যান কার্টিস হার্টেল সে সময় জানিয়েছিলেন, এই প্রাথমিক নির্বাচনের গুরুত্ব এতটাই বেশি ছিল যে আগের প্রাথমিক নির্বাচনগুলোর তুলনায় প্রায় পাঁচ লাখ বেশি ডেমোক্র্যাট ভোটার ভোট দিতে এসেছিলেন। সাধারণত এ ধরনের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম থাকে।
নির্বাচনী প্রচারের শেষ পর্যায়ে এসে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সমর্থনও পান এল-সায়েদ। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে ওবামা এখনো অন্যতম জনপ্রিয় ব্যক্তি।
কে এই আবদুল এল-সায়েদ?
৪২ বছর বয়সী এই রাজনীতিকের পুরো নাম আবদুলরহমান মোহাম্মদ এল-সায়েদ। তিনি একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন চিকিৎসককে বিয়ে করেছেন। তাঁদের দুই মেয়ে রয়েছে।
২০০৭ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হওয়ার সময় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়েছিলেন এল-সায়েদ। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। মঞ্চে এল-সায়েদের বক্তব্য দেওয়ার দক্ষতার প্রশংসা করেছিলেন তিনি।
মিশিগানেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা এল-সায়েদ পরে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ডেট্রয়েট ও ওয়েন কাউন্টির জনস্বাস্থ্য বিভাগের নেতৃত্ব দেন তিনি। এসব দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন। সে সময় তাঁর এই নির্বাচনী লড়াইকে অনেকেই কঠিন ও প্রায় অসম্ভব প্রচেষ্টা হিসেবে দেখেছিলেন।
তবে এর আগেও নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন এল-সায়েদ।
২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও জয় পাননি তিনি। তবে সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সবার জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। তাঁর এই পরিকল্পনার মূল কথা ছিল, দেশজুড়ে একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি চালু করা, যাতে সব নাগরিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ পান।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রে বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমার খরচ ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ফলে সবার জন্য সরকারি স্বাস্থ্যবিমা চালুর প্রস্তাবটি বাম ও ডান—উভয় রাজনৈতিক ধারার মানুষের কাছেই ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে এল-সায়েদের সমালোচনাও মানুষের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থানের সঙ্গে নিউইয়র্ক সিটির অত্যন্ত জনপ্রিয় মেয়র জোহরান মামদানির অবস্থানের বেশ মিল রয়েছে।
এল-সায়েদ বারবার বলেছেন, তিনি কখনো করপোরেট লবিস্টদের সঙ্গে বৈঠক করেননি। তাঁর দুই নির্বাচনী প্রচারেই করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবর্তে শুধু ব্যক্তিগত দাতাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছেন।
‘তিনি অন্যদের চেয়ে আলাদা’
তবে মামদানির মতো এল-সায়েদ ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সমর্থন পাননি। মিশিগানের মতো রাজনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি অঙ্গরাজ্যে দলের মধ্যপন্থী নেতাদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।
নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে থাকা ভোটারদের কাছেও পৌঁছাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন এল-সায়েদ। এ জন্য বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, পডকাস্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় ব্যক্তিদের অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, যত বেশি সম্ভব মার্কিন নাগরিকের কাছে নিজের বক্তব্য তুলে ধরা। বিভিন্ন সময়ে নিজেই এ কথা বলেছেন তিনি।
তবে প্রচারের সময় তাঁকে সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে এমন মাত্রায় প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় অনেক বেশি। এর ফলে একদিকে যেমন তিনি বেশি পরিচিত হয়ে ওঠেন, অন্যদিকে ভোটারদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতাও বেড়ে থাকতে পারে। অথচ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মাইক রজার্সকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে তেমন অনুসন্ধান বা আলোচনা হয়নি।
সে সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তাঁর মেয়াদের সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকলেও রজার্সকে সমর্থন দিয়েছিলেন তিনি।
ট্রাম্প বারবার এল-সায়েদকে ‘কমিউনিস্ট ব্যর্থ ব্যক্তি, যিনি ইহুদি ও ইসরায়েলকে ঘৃণা করেন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এমনকি তিনি বলেছেন, এল-সায়েদের নাম ধরে ডাকবেন না; বরং শুধু ‘মোহাম্মদ’ বলবেন। কারণ, ট্রাম্পের দাবি, অধিকাংশ মুসলমানের নামই মোহাম্মদ।
অন্যদিকে, রিপাবলিকান নেতারাও যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রতি এল-সায়েদের আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর সৎবোনের একসময়কার কিছু বক্তব্যের সূত্র ধরে তাঁর সঙ্গে মুসলিম ব্রাদারহুডের সম্পর্ক রয়েছে বলেও দাবি করেছেন তাঁরা।
তবে মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে এল-সায়েদের কোনো সম্পর্ক থাকার প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। সংগঠনটির কোনো একক কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও নেই। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন এর তিনটি রাজনৈতিক শাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবেও তালিকাভুক্ত করা হয়নি।
আগস্টে দেওয়া এক বক্তব্যে এল-সায়েদ বলেছিলেন, তাঁর নাম ও পরিচয়কে কেন্দ্র করে যে আলোচনা ও আক্রমণ চালানো হচ্ছে, সেটিই তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের হাতে থাকা একমাত্র কৌশল।
রিপাবলিকানদের আক্রমণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের কাছে মনে হচ্ছে, আরে, তিনি তো অন্যদের চেয়ে আলাদা।’
এরপর তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘তোমাদের কাছে এটাই সবচেয়ে বড় অভিযোগ? তোমরা আসলে কী করতে চাও, তা নিয়ে কথা বলতে পারো না? আমার নামের কারণে তোমাদের জ্বালানির দাম বাড়ছে না। আমার নামের কারণে আমাদের যুদ্ধে জড়াতে হচ্ছে না। আর তোমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার কেনার সামর্থ্য না থাকার কারণও আমার নাম নয়।’
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই