
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান রোমান গোফম্যান গত ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচনের আগে ইরানে একটি অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে ইসরায়েলি এক কর্মকর্তার অসাবধানতাবশত যুক্তরাষ্ট্রকে এ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দেওয়ায় ওয়াশিংটন দ্রুত পদক্ষেপ নেয় এবং অভিযানটি ঠেকিয়ে দেয়। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
চ্যানেল ১২-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এই অভিযানের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, এ ধরনের পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের সংঘাতের সূত্রপাত করতে পারে। পাশাপাশি নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে দেওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
তবে বিরোধিতা সত্ত্বেও অভিযানের প্রস্তুতি চলছিল। একপর্যায়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিভাগের এক কর্মকর্তা ভুলবশত যুক্তরাষ্ট্রকে পরিকল্পনার বিষয়টি জানিয়ে দেন। এরপর ওয়াশিংটন দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে অভিযানটি বন্ধ করার ব্যবস্থা করে।
তবে নেতানিয়াহুর কার্যালয় এই প্রতিবেদন অস্বীকার করেছে। কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী নিজেই তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট করেছিলেন, ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে ইরানে হামলার কোনো পরিকল্পনা ছিল না।’
নির্বাচনের আগের দিনগুলোতে ইরানকে লক্ষ্য করে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে নেতানিয়াহু ও দেশটির সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে মতবিরোধের যে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, নতুন এই প্রতিবেদন সেই বিতর্ককে আরও সামনে এনেছে।
গত ২৫ অক্টোবর, অর্থাৎ ইসরায়েলিরা ভোট দেওয়ার দুই দিন আগে, চ্যানেল ১২ নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল এয়াল জামিরের মধ্যে ‘নজিরবিহীন সংঘাতের’ খবর প্রকাশ করে। ইরানের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কায় প্রতিরক্ষা বিভাগের কর্মকর্তারা যে সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করছিলেন, তা নিয়েই তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
চ্যানেলটির প্রতিবেদনে বলা হয়, জামির ওই অভিযান পরিচালনার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এ বিষয়ে আরও আলোচনা করার পাশাপাশি নেতানিয়াহুর কাছ থেকে লিখিত অনুমোদনও চেয়েছিলেন তিনি। সামরিক অভিযানের আইনি বৈধতা রয়েছে, তা নিশ্চিত করতেই প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর করা নথি চেয়েছিলেন সামরিক বাহিনীর প্রধান।
চ্যানেল ১২-কে দেওয়া বক্তব্যে সামরিক বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি এমন একটি সামরিক পদক্ষেপের বিষয়, যা ইরানের সঙ্গে সংঘাত ছড়িয়ে দিতে পারে। এমন একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতি ভুলভাবে হিসাব করার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।’
প্রতিবেদনে নাম প্রকাশ না করা কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের জন্য ইরান ইস্যুকে কাজে লাগাতে চাইছে বলে সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল।
এর পরদিন, ২৬ অক্টোবর, অর্থাৎ নির্বাচনের এক দিন আগে চ্যানেল ১২ ও চ্যানেল ১৩ জানায়, নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ যে সামরিক পদক্ষেপ নিতে চেয়েছিলেন, তার বিরোধিতা করেছিলেন কেবল জামিরই। তাঁর আশঙ্কা ছিল, এ ধরনের পদক্ষেপ ইরানের সঙ্গে সংঘাত বাড়িয়ে দিতে পারে এবং নির্বাচনী কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
এ ছাড়া মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসও জানিয়েছিল, নেতানিয়াহু কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানে নতুন করে বিমান হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছিলেন। তবে জামিরের বাধার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, প্রকাশ্যে সরাসরি হামলা না চালিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে আলাদা একটি অভিযান পরিচালনার চেষ্টা করছিলেন নেতানিয়াহু। সামরিক বাহিনীর প্রধান জামিরের আশঙ্কা ছিল, এ ধরনের অভিযানও ইরানকে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে উসকে দিতে পারে।
নেতানিয়াহুর সমালোচক হিসেবে পরিচিত ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক গত বৃহস্পতিবার চ্যানেল ১২-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, নেতানিয়াহু মোসাদের মাধ্যমে ইরানকে ঘিরে একটি ‘উসকানিমূলক পদক্ষেপ’ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। আর সেটি করতে চেয়েছিলেন সামরিক বাহিনীর প্রধানকে কিছু না জানিয়েই।
নতুন করে হামলার আশঙ্কা
ইরানে কথিত ওই অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনার খবর এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতা করছে কাতার। অন্যদিকে সংঘাতের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে ভাবছে ওয়াশিংটন।
গত ১ নভেম্বর চ্যানেল ১২ জানায়, ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধ শুরু করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আহ্বান জানিয়েছিলেন নেতানিয়াহু।
দুই নেতার মধ্যে টেলিফোনে কথোপকথন সম্পর্কে অবগত ইসরায়েলি ও মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ট্রাম্প তখন তেহরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য আরও সময় দিতে চেয়েছিলেন।
নেতানিয়াহুর আশঙ্কা ছিল, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতা হলে দেশটির ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অনেকটাই কমে যেতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প চাইছিলেন, ইসরায়েল যেন কোনোভাবেই আলোচনার পথে বাধা সৃষ্টি না করে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পরও কাতারের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানি গত শনিবার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে ওয়াশিংটন এখনো আগ্রহী। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বলেন, ‘একটি নিখুঁত চুক্তির অপেক্ষায় আমরা বসে থাকতে পারি না। আমরা আশা করছি, অন্তত একটি ভালো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারব।’
অন্যদিকে শুক্রবার ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে। তবে একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রই সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
হোয়াইট হাউসের বাইরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইরানকে পরাজিত করেছি। ইরানের বিরুদ্ধে আমরা খুব ভালো অবস্থানে আছি। তাদের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। গত ছয় বা সাত মাসে আমাদের একজন সেনাও নিহত হয়নি।’
এ সময় তিনি আবারও নিজের আগের দাবির পুনরাবৃত্তি করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি যদি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে না থামাতাম, তাহলে আজ ইসরায়েল এবং প্রকৃতপক্ষে পুরো মধ্যপ্রাচ্যেরই অস্তিত্ব থাকত না।’
সূত্র: মিডিল ইস্ট আই