
তপ্ত রোদে যখন শরীর যেন আগুনের তাপে শুকিয়ে যায়, তখন এক গ্লাস ঠান্ডা শরবতে ভেসে থাকা তোকমার দানা অনেকের কাছে হয়ে ওঠে নিঃশব্দ স্বস্তির আশ্রয়। শুধু স্বাদ নয়, পুষ্টিগুণেও ভরপুর এই ছোট দানা গরমে শরীর ঠান্ডা রাখা থেকে শুরু করে হজম ঠিক রাখা পর্যন্ত নানা উপকারে ভূমিকা রাখছে বলে জানাচ্ছে আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান।
তোকমা মূলত সুইট বেসিল গাছের বীজ, পানিতে ভিজলেই যা ফুলে ওঠে স্বচ্ছ জেলির মতো আবরণে। এই জেলির ভেতরেই লুকিয়ে থাকে ফাইবার, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের মিশেল। পুষ্টিবিদদের ভাষায়, এটি এমন এক খাবার যা একই সঙ্গে শরীরকে ঠান্ডা রাখে আবার ভেতর থেকে শক্তিও জোগায়।
গরমের দিনে তোকমার সবচেয়ে বড় ভূমিকা শরীরকে শীতল রাখা। পানিতে ভিজে জেলির মতো হয়ে ওঠা দানা শরীরে পানির উপস্থিতি দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে সাহায্য করে। ফলে তৃষ্ণা কম লাগে, পানিশূন্যতার ঝুঁকিও কিছুটা কমে। এক পুষ্টিবিদ একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তোকমা পানির সঙ্গে মিশে শরীরে একধরনের ঠান্ডা প্রভাব তৈরি করে, যা গরমে আরাম দেয়।’
হজমের ক্ষেত্রেও তোকমা নীরব সহযোদ্ধা। এতে থাকা উচ্চমাত্রার ফাইবার অন্ত্রের গতি স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে, কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়। অনেকের জন্য এটি যেন ভেতরের অচল নদীতে হালকা স্রোত বইয়ে দেওয়ার মতো কাজ করে। পাশাপাশি ফাইবার বেশি থাকায় পেট ভরা অনুভূতি দেয়, ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতাও কমে।
হৃদ্স্বাস্থ্য নিয়েও গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত মিলেছে। তোকমায় থাকা ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড প্রদাহ কমাতে সহায়ক হতে পারে এবং কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান শরীরের কোষকে ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যালের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতেও কাজ করে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
খাওয়ার পদ্ধতিতে আছে সহজ নিয়ম, আর সেই নিয়ম মানলেই মেলে সর্বোচ্চ উপকার। সাধারণত এক থেকে দুই চা চামচ তোকমা এক কাপ পানিতে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট ভিজিয়ে নিতে হয়। ভিজে গেলে দানাগুলো ফুলে ওঠে, তখন সেটি লেবুর শরবত, ফলের জুস, দুধ বা দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যায়। অনেকেই আবার স্মুদি বা ঠান্ডা ডেজার্টেও এটি ব্যবহার করেন। তবে একটি বিষয় জোর দিয়ে বলা হয়, কখনোই শুকনা তোকমা খাওয়া ঠিক নয়।
কিন্তু সব ভালো জিনিসেরই যেমন সীমা আছে, তোকমার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। অতিরিক্ত খেলে ফাইবারের কারণে পেট ফাঁপা, অস্বস্তি বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার ভিজানো দানার জেলি স্বভাবের কারণে শিশু বা গিলতে সমস্যা আছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, প্রথমে অল্প পরিমাণে শুরু করে ধীরে ধীরে অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো।
সব মিলিয়ে তোকমা যেন গরমের দিনে এক নীরব সঙ্গী, যার উপস্থিতি চোখে পড়ে না, কিন্তু শরীরের ভেতরে নিঃশব্দে কাজ করে যায়। তবে এটিকে অলৌকিক কোনো সমাধান ভাবার সুযোগ নেই। নিয়ম মেনে, পরিমিতভাবে এবং সঠিকভাবে খাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর আসল উপকার।
তথ্যসূত্র: হেলথলাইন, মেডিকেল নিউজ টুডে, সায়েন্সডাইরেক্টে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন।