
এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন নেক্সাস টেলিভিশনের মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, মানসিক নির্যাতন, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) টেলিভিশনটির চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) অ্যান্ড হেড অব প্রোগ্রাম মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ কমিটি গঠনের বিষয়টি জানানো হয়।
অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মীর পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবীর মাধ্যমে প্রেরিত আইনি নোটিশে কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি, মানসিক নির্যাতন, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং বেআইনিভাবে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করার অপচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ নিরাপদ রাখতে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানের প্রোগ্রাম প্রোডিউসার জাকিয়া সুলতানাকে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন সিনিয়র অনলাইন ভিডিও এডিটর স্বপন বীর, সিনিয়র ভিডিও এডিটর (ইনচার্জ) মাইনুল হোসেন, প্রোগ্রাম প্রোডিউসার ফাহিমা শারমিন দীপ্তি এবং সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন অর্থ ও হিসাব বিভাগের ইনচার্জ জুবায়ের আহমেদ।
অফিস আদেশে কমিটির কার্যপরিধি হিসেবে ঘটনার প্রকৃতি উদ্ঘাটন, দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ, অভিযোগকারী ও অভিযুক্তসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে লিখিত প্রতিবেদন ও সুপারিশ পেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ১৫ জুন অভিযোগকারী কর্মীর পক্ষে আইনজীবী অ্যাডভোকেট হায়দার তানভীরুজ্জামান অভিযুক্তের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায় একটি আইনি নোটিশ পাঠান। নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সাল থেকে কর্মরত ওই নারী কর্মী চলতি বছরের জানুয়ারিতে কামরুল হাসানের যোগদানের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে হয়রানির শিকার হন।
আইনি নোটিশে অভিযোগ করা হয়, কর্মক্ষেত্রে অশোভন আচরণ, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গকে ইঙ্গিত করে অশালীন মন্তব্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, পদের দায়িত্বের বাইরে কাজ চাপিয়ে দেওয়া এবং পরবর্তীতে বিভাগ পরিবর্তন ও নিম্নতর পদে স্থানান্তরের মাধ্যমে তাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করার চেষ্টা করা হয়। এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে দূরে রাখা, ভিত্তিহীন অভিযোগ উত্থাপন এবং কর্মস্থল ও দায়িত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে ধারাবাহিক চাপ সৃষ্টি করার অভিযোগও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
নোটিশে আরও দাবি করা হয়, অভিযোগকারীর ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বকেয়া বেতন ও অন্যান্য প্রাপ্য বাবদ মোট ২ লাখ ২ হাজার ৪৮৯ টাকা পাওনা রয়েছে।
আইনি নোটিশে ৩০ দিনের মধ্যে পাঁচ দফা ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে অভিযোগ অনুযায়ী মানসিক হয়রানি ও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধ করা, যৌন হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগকারীকে পূর্বের পদ ও দায়িত্বে বহাল রাখা, বকেয়া পাওনা পরিশোধ এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ ও বৈষম্যহীন পরিবেশ নিশ্চিত করা।
নোটিশে উল্লেখ করা হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে বাংলাদেশ শ্রম আইন, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইনের আওতায় পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
আইনি নোটিশের অনুলিপি এস আলম গ্রুপের ডিজিএম (অ্যাকাউন্টস), নেক্সাস টেলিভিশনের সিওও, জাতীয় প্রেসক্লাব, অনলাইন এডিটরস অ্যালায়েন্স, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে মো. কামরুল হাসান বলেন, “একজন অভিযোগ করেছেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে বোঝা যাবে অভিযোগটি সত্য নাকি মিথ্যা।”
নেক্সাস টেলিভিশনের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) অ্যান্ড হেড অব প্রোগ্রাম মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, “আমরা তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। প্রতিবেদন আসুক, অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট হায়দার তানভীরুজ্জামান বলেন, “আমরা আইনি নোটিশ দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠান তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যা একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযোগের সুষ্ঠু নিষ্পত্তি, বকেয়া পাওনা পরিশোধ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজনে আমরা উপযুক্ত আদালত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের শরণাপন্ন হব।”