
জাতীয় সনদ জুলাই কেবল একটি কাগজে ছাপা দলিল নয়, বরং ১৬ বছরের বেশি সময়ে গুম হওয়া মানুষের পরিবার-পরিজনের যন্ত্রণার প্রতিফলন এবং ২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের বিনিময়ে গড়ে উঠেছে। তাই অন্তর্বর্তী সরকার এই সনদের ভিত্তিতে গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে সক্ষম—এমন মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও সরকারের গণভোট প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে ‘গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে বিভাগীয় মতবিনিময় সভা’তে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “এই সনদ তৈরি হয়েছে ১৬ বছরের বেশি সময়ে গুম হওয়া মানুষের পরিবার-পরিজনের হাহাকার থেকে। যে মা তার সন্তানকে হারিয়েছে, তার প্রতিদিনের অশ্রু দিয়ে তৈরি হয়েছে জুলাই সনদ। তরুণ শিক্ষার্থী, ছোট ব্যবসায়ী ও সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ যেভাবে প্রাণ দিয়েছেন, সেই প্রাণের বিনিময়ে তৈরি হয়েছে এই সনদ। এটিই ভবিষ্যতের পথরেখা।”
গণভোট প্রশ্নে সরকারের নৈতিক ও আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, “কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচার করতে পারবেন কি না। সংবিধান, বিদ্যমান আইন ও আরপিও কোথাও এটি নিয়ে কোনো বাধা নেই। এছাড়া গণভোট সংক্রান্ত অধ্যাদেশেও কোনো বিধিনিষেধ নেই। সরকার যদি প্রস্তাব দেয়, তবে সমর্থন চাওয়াও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ১৯৭২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ৪৮টি গণভোট হয়েছে, অধিকাংশে সরকার হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচার করেছে।”
তিনি বলেন, “এই সরকার রক্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটিকে সাধারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলা ভুল হবে। সরকারের নৈতিক ভিত্তি হলো ১৪০০ মানুষের আত্মদান এবং হাজার হাজার আহত মানুষের ত্যাগ। জুলাই জাতীয় সনদ ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ৯ মাসের আলোচনার পর তৈরি হয়েছে।”
গণভোটের প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সনদ তৈরি হলেও গণভোট অপরিহার্য দুটি কারণে। প্রথমত, সব রাজনৈতিক দল দেশের জনগণের পুরোপুরি প্রতিনিধিত্ব করে না। এছাড়া রাষ্ট্র সংস্কারের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে সাধারণ জনগণের সম্মতি নেওয়াও জরুরি। দ্বিতীয়ত, আইনি সুরক্ষা। গণভোটের মাধ্যমে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে সংবিধান সংস্কারের সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেট দেওয়া হবে। এতে কেউ আদালতে প্রশ্ন তুলতে পারবে না যে এই সংসদের কি সংবিধান সংশোধনের অধিকার ছিল।”
তিনি আরও জানান, “আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ প্রথম ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। এই সময়ের মধ্যে জুলাই সনদের সংস্কার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে, পরে তারা সাধারণ সংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।”
জুলাই সনদের মূল বিষয়গুলো তুলে ধরে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা, দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকা, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, পিএসসি ও দুদক গঠন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে একজন ব্যক্তি এক জীবনে ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না।”
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার বিষয়ে তিনি বলেন, “উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে নির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। হাইকোর্টের বেঞ্চ বিভাগীয় পর্যায়ে আনা হচ্ছে যাতে সাধারণ মানুষ সহজে বিচার পান।”
সংসদ সদস্যদের স্বাধীন ভোটাধিকার বিষয়ে তিনি জানান, “সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যদের দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। জুলাই সনদে বলা হয়েছে বাজেট ও অনাস্থা ছাড়া সংসদ সদস্যরা তাদের বিবেক অনুযায়ী ভোট দিতে পারবেন। এতে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে তারা তাদের এলাকার সমস্যা তুলে ধরতে পারবেন।”
সভায় তিনি শহীদ সোহেল রানার কথা স্মরণ করেন, “সোহেল রানা প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হতে চায়নি, তিনি ফ্যাসিবাদের অবসান চেয়েছিলেন। ১৪০০ শহীদ এবং হাজার হাজার আহত মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্র সংস্কার ও গণভোট আয়োজন করা হচ্ছে।”
সভায় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার মো. শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (সিনিয়র সচিব) মনির হায়দার। এছাড়া প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।