
সহিংসতা ও জালিয়াতির অভিযোগের মধ্যেই উগান্ডার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিক ইয়োওয়েরি মুসেভেনি। শনিবার উগান্ডা নির্বাচন কমিশনের প্রধান আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে সপ্তমবারের মতো রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকছেন তিনি।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে ৮১ বছর বয়সী মুসেভেনি কার্যত পঞ্চম দশকে নিজের শাসনকালকে এগিয়ে নিলেন। বিশ্লেষকদের মতে, ফলাফল তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্ত করবে—বিশেষ করে উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে চলমান জল্পনার প্রেক্ষাপটে।
শনিবার রাজধানী কাম্পালায় নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় জানানো হয়, মুসেভেনি মোট ভোটের প্রায় ৭২ শতাংশ পেয়েছেন। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, পপসংগীতশিল্পী থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা ববি ওয়াইন পেয়েছেন ২৪ শতাংশ ভোট।
নির্বাচনে ব্যাপক জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছেন ওয়াইন। ভোটের সময় ‘ভুল তথ্য’ ঠেকানোর যুক্তিতে কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট বন্ধ রাখে। ফল ঘোষণার পর জালিয়াতির অভিযোগে সমর্থকদের বিক্ষোভে নামার আহ্বান জানান ওয়াইন। তবে শনিবার তার অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি।
ওয়াইনের দাবি, তার বাড়িতে সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি সেখান থেকে সরে গেছেন বলেও জানান। তার ঘনিষ্ঠ রাজনীতিকরা রয়টার্সকে বলেছেন, তিনি উগান্ডার ভেতরেই আত্মগোপনে আছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ওয়াইন লিখেছেন, “গত রাতটি আমাদের বাড়িতে অত্যন্ত কঠিন ছিল... সেনাবাহিনী ও পুলিশ আমাদের বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে। তারা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং আমাদের কিছু সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে দেয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমি নিশ্চিতভাবে তাদের হাত থেকে পালাতে পেরেছি। বর্তমানে আমি বাড়িতে নেই।” একই পোস্টে জানান, তার স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যরা গৃহবন্দী অবস্থায় আছেন। তবে এসব অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
সহিংসতা ও বিতর্ক
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার খবর আসে। পুলিশ জানায়, উগান্ডার মধ্যাঞ্চলে স্থানীয় সংসদ সদস্য মুওয়াঙ্গা কিভুম্বির সংগঠিত বিরোধী ‘দুষ্কৃতকারীদের’ হামলার মুখে আত্মরক্ষায় গুলি চালানো হয়। এতে সাতজন নিহত ও তিনজন আহত হন।
তবে কিভুম্বি এই দাবি অস্বীকার করে বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী তার বাড়িতে ঢুকে ১০ জনকে হত্যা করেছে।
গত অক্টোবরে প্রতিবেশী তানজানিয়ায় নির্বাচনের পর যে মাত্রার সহিংসতায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়, উগান্ডায় তেমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। এবারের নির্বাচনে মুসেভেনির জয় খুব একটা অপ্রত্যাশিত ছিল না। ১৯৮৬ সালে বিদ্রোহের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর তিনি বয়সসীমা ও মেয়াদসীমা তুলে দিতে সংবিধান দু’বার সংশোধন করেন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখেন।
২০২১ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি ওয়াইনকে ৫৮ শতাংশ ভোটে পরাজিত করেছিলেন। সে নির্বাচনকে যুক্তরাষ্ট্র অবাধ ও সুষ্ঠু নয় বলে মন্তব্য করেছিল।
এবারের প্রচারণা চলাকালে ওয়াইনের সমাবেশে বারবার টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও গুলিবর্ষণের অভিযোগ ওঠে। সহিংসতায় অন্তত একজন নিহত হন এবং শত শত বিরোধী সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও সোমালিয়ার মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সেনা পাঠানো এবং বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে মুসেভেনি প্রশংসা পেয়েছেন। উগান্ডার অনেক নাগরিক তার শাসনামলে আপেক্ষিক স্থিতিশীলতার কথাও তুলে ধরছেন। ‘সব অর্জন রক্ষা করো’ স্লোগান নিয়ে তিনি এবারের প্রচারণা চালান।
চলতি বছর অপরিশোধিত তেলের উৎপাদন শুরু হলে উগান্ডার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণ অঙ্কে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মুসেভেনির উত্তরসূরি হিসেবে তার ছেলে, সেনাবাহিনীর প্রধান মুওজি কাইনেরুগাবাকে এগিয়ে আনার আলোচনা রয়েছে। যদিও তিনি ছেলেকে প্রস্তুত করার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
চলতি সপ্তাহে স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্ষমতা ছাড়ার প্রশ্ন নাকচ করে মুসেভেনি বলেন, “আমি যদি সুস্থ থাকি, মারা না যাই, বার্ধক্যজনিত দুর্বলতায় না ভুগি, আমার কিছুটা জ্ঞান থাকে, যদি সত্যিই দেশের ব্যাপারে আন্তরিক হই; তাহলে কেন আমার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে চাইবেন না?”
সূত্র: রয়টার্স