
পদ্মার বুকে ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় শোকস্তব্ধ রাজবাড়ী ও আশপাশের জনপদ। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পন্টুন থেকে যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ জনে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, উদ্ধার ও শনাক্তকরণ শেষে নিহতদের মধ্যে ২৩ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২২ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৫ নম্বর ফেরিঘাটে এই দুর্ঘটনা ঘটে। পন্টুন থেকে বাসটি নদীতে পড়ে গেলে তা উদ্ধারে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান চালায় উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’। রাত প্রায় ১১টার দিকে বাসটি পানির নিচ থেকে টেনে তোলা সম্ভব হয়। বাসের ভেতর এবং পরবর্তী উদ্ধার অভিযানে নদী থেকে মোট ২৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
দুর্ঘটনার কারণ খুঁজে বের করা এবং দায় নির্ধারণে জেলা প্রশাসন ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বুধবার গভীর রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন রাজবাড়ীর অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট। অন্যদিকে, মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত সচিব মুহিদুল ইসলামকে। উভয় কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মো. রাজিব আহসান বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানা যাবে। প্রতিবেদনে যাদের দায়ী করা হবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে সরকার।’
শনাক্তকৃত নিহতদের তালিকা:
১. রেহেনা আক্তার (৬১), স্বামী: মৃত ইসমাঈল হোসেন খান, গ্রাম- ভবানীপুর, লালমিয়া সড়ক, রাজবাড়ী পৌরসভা।
২. মর্জিনা খাতুন (৫৬), স্বামী: মো. আবু বক্কর সিদ্দিক, গ্রাম- মজমপুর, ওয়ার্ড-১৮, কুষ্টিয়া পৌরসভা।
৩. রাজীব বিশ্বাস (২৮), পিতা: হিমাংশু বিশ্বাস, গ্রাম- খাগড়বাড়ীয়া, কুষ্টিয়া সদর।
৪. জহুরা অন্তি (২৭), পিতা: মৃত ডা. আবদুল আলীম, গ্রাম- সজ্জনকান্দা, রাজবাড়ী পৌরসভা।
৫. কাজী সাইফ (৩০), পিতা: কাজী মুকুল, গ্রাম- সজ্জনকান্দা, রাজবাড়ী পৌরসভা।
৬. মর্জিনা আক্তার (৩২), স্বামী: রেজাউল করিম, গ্রাম- চর বারকিপাড়া, ছোট ভাকলা, গোয়ালন্দ।
৭. ইস্রাফিল (৩), পিতা: দেলোয়ার হোসেন, গ্রাম- ধুশুন্দু, সমাজপুর, খোকসা, কুষ্টিয়া।
৮. সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), পিতা: রেজাউল করিম, গ্রাম- চর বারকিপাড়া, ছোট ভাকলা, গোয়ালন্দ।
৯. ফাইজ শাহানূর (১১), পিতা: বিল্লাল হোসেন, গ্রাম- ভবানীপুর, বোয়ালিয়া, কালুখালী।
১০. তাজবিদ (৭), পিতা: কেবিএম মুসাব্বির, গ্রাম- সজ্জনকান্দা, রাজবাড়ী পৌরসভা।
১১. আরমান খান (৩১), পিতা: আরব খান, গ্রাম- পশ্চিম খালখোলা, বালিয়াকান্দি (বাস চালক)।
১২. নাজমিরা ওরফে জেসমিন (৩০), স্বামী: আব্দুল আজিজ, গ্রাম- বেলগাছি, মদেন্দ্রপুর, কালুখালী।
১৩. লিমা আক্তার (২৬), পিতা: সোবাহান মণ্ডল, গ্রাম- রামচন্দ্রপুর, মিজানপুর, রাজবাড়ী সদর।
১৪. জোস্ন্যা (৩৫), স্বামী: মান্নান মণ্ডল, গ্রাম- বড় চর বেনিনগর, মিজানপুর, রাজবাড়ী সদর।
১৫. মুক্তা খানম (৩৮), স্বামী: মৃত জাহাঙ্গীর আলম, পিতা: সিদ্দিকুর রহমান, গ্রাম- নোয়াধা, আমতলী, কোটালীপাড়া, গোপালগঞ্জ।
১৬. নাছিমা (৪০), স্বামী: মৃত নূর ইসলাম, গ্রাম- মথুয়ারাই, পলাশবাড়ী, পার্বতীপুর, দিনাজপুর।
১৭. আয়েশা আক্তার সুমা (৩০), স্বামী: নুরুজ্জামান, গ্রাম- বাগধুনিয়া পালপাড়া, আশুলিয়া, ঢাকা।
১৮. সোহা আক্তার (১১), পিতা: সোহেল মোল্লা, রাজবাড়ী পৌরসভা।
১৯. আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), পিতা: গিয়াসউদ্দিন রিপন, গ্রাম- সমসপুর, খোকসা, কুষ্টিয়া।
২০. আরমান (৭ মাস), পিতা: নুরুজ্জামান, গ্রাম- খন্দকবাড়িয়া, কাচেরকোল, শৈলকুপা, ঝিনাইদহ।
২১. আব্দুর রহমান (৬), পিতা: আব্দুল আজিজ, গ্রাম- মহেন্দ্রপুর, রতনদিয়া, কালুখালী।
২২. সাবিত হাসান (৮), পিতা: শরিফুল ইসলাম, গ্রাম- আগমারাই, দাদশি, রাজবাড়ী সদর।
২৩. আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), পিতা: ইসমাইল হোসেন খান, গ্রাম- ভবানীপুর, রাজবাড়ী সদর।
এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে হাসপাতাল ও দুর্ঘটনাস্থল। নিখোঁজদের খোঁজে এখনও অনেক পরিবার ছুটে বেড়াচ্ছে।