
"সন্তান আমার, রাষ্ট্রের নয়"—একজন নিরুপায় বাবার এমন এক গভীর আকুতি ও বেদনাবোধের চিঠি তোলপাড় সৃষ্টি করেছে দেশজুড়ে। দেশে প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার আবহে নিজের মাত্র ৪ বছর বয়সী অবুঝ কন্যাসন্তানের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৈধ একটি শটগানের লাইসেন্স চেয়ে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরে আবেদন করেছেন বরগুনার এক বাসিন্দা।
গত বৃহস্পতিবার (২১ মে) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বরাবর এই নজিরবিহীন ও আবেগময় আবেদনপত্রটি পেশ করেছেন মাসুদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি।
আবেদনকারী মাসুদুল ইসলামের স্থায়ী নিবাস বরগুনা জেলার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের ডালাচারা গ্রামে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে পাঠানো ওই পত্রে তিনি বর্তমান সমাজে শিশুদের ওপর চলমান বর্বরতা, নৃশংসতা ও চরম নিরাপত্তাহীনতার চিত্র ফুটিয়ে তুলে নিজের একমাত্র কন্যাসন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে এক বাবার বুকফাটা আর্তনাদ ও গভীর উৎকণ্ঠার কথা ব্যক্ত করেন।
আবেদনপত্রে মাসুদুল ইসলাম দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি তুলে ধরে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে উল্লেখ করেন, ‘আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী স্বাধীন বাংলাদেশের একজন বৈধ নাগরিক। আমার একজন কন্যা সন্তান আছে, যার বয়স ৪ বছর। কিছু বছর যাবৎ শিশুদের প্রতি বর্বরতার চিত্র ও তা নিয়ে রাষ্ট্রের উদাসীনতা দেখে আমি আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবন পরিচালনায় ব্যর্থ হচ্ছি।’
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর চরম ক্ষোভ উগরে দিয়ে ওই চিঠিতে তিনি আরও লিখেছেন, ‘বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণে দেখলাম সন্তান আমার, রাষ্ট্রের নয়। তাই রাষ্ট্রের কাছে তার নিরাপত্তা চেয়ে মহামান্যদের উপভোগ্য ক্ষমতার মহামূল্যবান সময় নষ্ট করে নিজেকে কলুষিত করবো না। আমার নিষ্পাপ সন্তানের নিরাপত্তার দায়িত্ব আমি নিজেই নিতে চাই বিধায় বৈধ উপায়ে একটি শটগান একান্ত প্রয়োজন।’
আবেদনের শেষাংশে তিনি যাতে একটি বৈধ শটগান পেতে পারেন, সেজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। একই সাথে আবেদনপত্রটির সাথে নিজের যাবতীয় তথ্যের দুই সেট আনুষঙ্গিক নথিপত্রও সংযুক্ত করেছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে এই ব্যতিক্রমী ও সংবেদনশীল আবেদনপত্রটির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। নেটিজেনদের মাঝে এটি ব্যাপক আলোচনা ও গভীর মানবিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
এলাকার সাধারণ বাসিন্দাদের মতে, এটি কেবল আত্মরক্ষার জন্য কোনো আগ্নেয়াস্ত্রের আবেদন নয়; বরং এটি হলো সমাজের অবক্ষয়ের মুখে একজন অসহায় পিতার চরম আতঙ্ক, মানসিক হতাশা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা সংকটের এক জ্যান্ত দলিল। অনেকে একে বর্তমান সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার এক নির্মম প্রতীকী চিত্র হিসেবেও বর্ণনা করছেন।
সমাজে সাধারণ মানুষের এমন মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার বিষয়ে বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী আরিফুর রহমান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "এ ধরনের আবেদন সমাজের অসুস্থ পরিস্থিতির একটি প্রতিফলন। মানুষ এখন বিচার ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে। এটি রাষ্ট্রের জন্যও একটি সতর্কবার্তা।"
চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে বিভিন্ন মাধ্যমে আবেদনকারী মাসুদুল ইসলামের সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো খোঁজ মেলেনি। অন্যদিকে, সংবেদনশীল এই চিঠির বিষয়ে স্থানীয় কিংবা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার কাছ থেকেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।