
রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে পাশবিক নির্যাতন ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রেকর্ড সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন হওয়াকে দেশের বিচারিক ইতিহাসের এক অভূতপূর্ব ও অনন্য মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন যে, এই যুগান্তকারী রায়ের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা যেমন পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, তেমনি পুরো জাতির ওপর চেপে বসা এক গভীর কলঙ্কের দাগ মোচন হওয়ার পথ সুগম হয়েছে।
আজ রোববার (৭ জুন) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে আইনমন্ত্রী এই চাঞ্চল্যকর মামলার আদ্যোপান্ত ও দ্রুততম সময়ে রায় ঘোষণার নেপথ্য পটভূমি তুলে ধরেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ঘটনার পর যেখানে ভিক্টিমের পরিবার বিচার পাওয়া নিয়ে চরম সংশয় প্রকাশ করে বলেছিল যে তারা বিচার চায় না, সেখানে সরকারের বিশেষ তৎপরতা, পুলিশের দ্রুততম তদন্ত এবং আদালতের ছুটি বাতিলের অভূতপূর্ব সমন্বয়ে এই দৃষ্টান্তমূলক রায় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই এ মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে এবং এটি বিচারপ্রক্রিয়ার দক্ষতা ও কার্যকারিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে থাকবে।
বিবৃতিতে মামলার দ্রুত অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, গত ১৯ মে পল্লবী এলাকায় শিশু রামিসা নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে মাত্র সাত ঘণ্টার ব্যবধানে প্রধান দুই আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। ঘটনার ভয়াবহতা ও গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদল তাৎক্ষণিকভাবে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে দেখা করেন।
সে সময় রামিসার পিতা দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতার কারণে চরম হতাশা ব্যক্ত করে বলেছিলেন যে তিনি বিচার চান না, কারণ অতীতে এ জাতীয় ঘটনার বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর। সরকারের সেই অনড় প্রতিশ্রুতির আলোকেই পুলিশ বাহিনী নজিরবিহীন তৎপরতা দেখিয়ে মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় অর্থাৎ ২৪ মে দুপুর ১২টার মধ্যে আদালতে নিখুঁত তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট দাখিল করে এবং একই দিন বিকেলের মধ্যে তা সংশ্লিষ্ট ট্রাইবুনালে পাঠানো হয়।
আসাদুজ্জামান জানান, বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে শেষ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ১ জুন থেকে নিম্ন আদালতগুলোর পূর্বনির্ধারিত ১৫ দিনের গ্রীষ্মকালীন ছুটি। তবে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে গঠিত বিশেষ ট্রাইবুনালগুলোকে সচল রাখতে সরকারের বিশেষ অনুরোধে প্রধান বিচারপতি এই ট্রাইবুনালগুলোকে ছুটির আওতাবহির্ভূত রাখার ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন।
মামলার নিরপেক্ষতা রক্ষা এবং আসামি পক্ষ যাতে পরবর্তীতে বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো আইনি প্রশ্ন বা বিতর্ক তুলতে না পারে, সেজন্য রাষ্ট্রপক্ষ থেকে ২৪ মে আসামিদের পক্ষে আইনি লড়াই লড়তে ‘স্টেট ডিফেন্স ল’য়ার’ বা সরকারি আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ঈদের ছুটি শেষে ১ জুন আদালত খোলার দিনই মামলার অভিযোগ (চার্জ) গঠন করা হয়। পরদিন ২ জুন অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ করা হয় এবং পরবর্তী দুই দিনে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক সম্পন্ন হয়। শুক্রবার ও শনিবার আদালত বন্ধ থাকার পর আজ ৭ জুন মাত্র ৪১ মিনিটের রায় পর্যালোচনা ও আদেশ পাঠের মধ্যদিয়ে আদালত মূল আসামি সোহেল এবং তার সহযোগিতাকারী স্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
যুগান্তকারী এই রায়ের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাও সেতুং-এর ঐতিহাসিক উক্তি স্মরণ করে আইনমন্ত্রী বলেন, কিছু মৃত্যু থাই পাহাড়ের মতো ভারী আর কিছু মৃত্যু পাখির পালকের মতো হালকা। রামিসার নির্মম মৃত্যু পুরো জাতির বুকে পাহাড়সম ভার হয়ে চেপে বসেছিল, যা এই ফাঁসির রায় কার্যকরের মাধ্যমে হালকা হবে।
বিবৃতির শেষাংশে আইনমন্ত্রী আরও আশ্বস্ত করেন যে, শুধু রামিসা হত্যাকাণ্ডই নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া দেশের অন্যান্য স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ে শেষ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ও নিবিড় তদারকি জোরদার করা হয়েছে।