
চীনের তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। ৪.৫ প্রজন্মের এই বহুমুখী যুদ্ধবিমান সংগ্রহের জন্য তৈরি করা খসড়া প্রস্তাব এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে পাঠানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে প্রয়োজনীয় বাজেট পাওয়া গেলে দ্রুতই ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। তা সম্ভব না হলে পরবর্তী অর্থবছরে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়া হবে। প্রস্তাবিত প্যাকেজে জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি চীনা অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি পরিবহন হেলিকপ্টার ও ড্রোন কেনার বিষয়ও রয়েছে।
জে-১০সিই মূলত চীনের চেংদু জে-১০সি যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ। এক ইঞ্জিনের এ যুদ্ধবিমান আকাশযুদ্ধের পাশাপাশি স্থল লক্ষ্যবস্তুতে হামলা, নজরদারি এবং দূরপাল্লার বিভিন্ন মিশনে ব্যবহারের উপযোগী। এর সর্বোচ্চ গতি প্রায় মাখ ১.৮ থেকে ২। আধুনিক রাডার এবং আকাশ থেকে আকাশ ও আকাশ থেকে স্থল—দুই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র বহনের সক্ষমতাও রয়েছে।
বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে জে-১০ যুদ্ধবিমানের কথিত সাফল্যও প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন জাহেদুর রহমান। ওই সংঘাতে পাকিস্তানের জে-১০সিই যুদ্ধবিমান এবং পিএল-১৫ দূরপাল্লার আকাশযুদ্ধের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বাংলাদেশ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছে। তবে ওই সংঘাতে কতটি ভারতীয় রাফাল ভূপাতিত হয়েছিল এবং কোন অস্ত্র কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল, তা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে।
বাংলাদেশ কতটি জে-১০সিই কিনবে এবং চুক্তির মোট মূল্য কত হবে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে এর আগে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০টি চীনা জে-১০ যুদ্ধবিমান কেনার প্রাথমিক পরিকল্পনায় সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ২২০ কোটি ডলার ধরা হয়েছিল। ওই হিসাবের মধ্যে যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি খুচরা যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ, পরিবহন, বিমা ও অন্যান্য সরঞ্জামের খরচও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, জে-১০সিই কেনা শুধু সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের বিষয় নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা আধুনিকায়ন এবং আঞ্চলিক কৌশলগত হিসাবও জড়িত। তুলনামূলক কম খরচে আধুনিক সক্ষমতা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় এবং বৈদেশিক সম্পর্কের বিষয়গুলোও ক্রয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জে-১০সিই যুক্ত হলে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে বিমানবাহিনীর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যুদ্ধবিমান চীনা প্রযুক্তিনির্ভর পুরোনো প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল। নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান যুক্ত হলে আকাশ প্রতিরক্ষা, দূরপাল্লার আকাশযুদ্ধ এবং বহুমুখী সামরিক অভিযানে সক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর পাশাপাশি চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের সামরিক যোগাযোগ সম্প্রতি বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দুই দেশের বিমানবাহিনী প্রধানেরা সম্ভাব্য জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান কেনা, প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মহাকাশ-প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।
সবকিছু মিলিয়ে, জে-১০সিই, হেলিকপ্টার ও ড্রোন নিয়ে প্রস্তাবিত প্যাকেজ বাস্তবায়িত হলে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় প্রতিরক্ষা ক্রয়ে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি বিমানবাহিনীর সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানোর একটি বড় উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সূত্র: ডন, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, আনাদুলু এজেন্সি ও রয়টার্স।