.jpg)
দেশে চলমান গ্যাসসংকট আগামী ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শুক্রবার ঢাকা-১৭ নির্বাচনী এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও মন্দিরে চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি, গ্যাস সরবরাহে সংকটের পেছনের কারণ এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম
তারেক রহমান বলেন, দেশে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি নিয়ে সমস্যা রয়েছে এবং সরকার এ বাস্তবতা অস্বীকার করছে না। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের মতো বাংলাদেশও জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে।
তিনি বলেন, সরকার গঠনের মাত্র ১২ দিন পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক বাজারে, বেড়ে যায় তেলের দাম। শুরুতে মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি না করতে সরকার তেলের দাম বাড়াতে চায়নি।
তারেক রহমানের ভাষ্য, পরে দেখা যায়, কিছু অসাধু ব্যক্তি তেলকে এমনভাবে ব্যবহার করতে শুরু করেন, যার নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর গিয়ে পড়ে। পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত সরকার তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রথমে চাইনি তেলের দাম বাড়াতে। কিন্তু আমরা দেখেছি যে কিছু সংখ্যক অসৎ মানুষ, সামান্য গুটিকয়েক অসৎ মানুষ, তারা তেলটাকে এমনভাবে ব্যবহার শুরু করল যার একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া গিয়ে মানুষের ওপর পড়ল। তখন বাধ্য হয়ে আমরা তেলের দাম বাড়িয়েছি।’
গ্যাস সরবরাহে সংকটের পেছনে জাহাজে আগুন
দেশে উৎপাদিত গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে নতুন গ্যাসকূপ খনন না হওয়ায় বিদেশ থেকে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে বলে জানান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, আমদানি করা গ্যাস গ্রহণের জন্য সমুদ্রে দুটি বড় জাহাজ রয়েছে। প্রায় এক থেকে দেড় মাস আগে ওই দুটি জাহাজের একটিতে আগুন লাগে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘হতে পারে এটা স্যাবোটেজ, হতে পারে এটা অ্যাক্সিডেন্ট। সেটা তদন্তের পরে বলা যাবে, আমরা এখনো সঠিকভাবে বলতে পারছি না।’
তবে চলমান সংকট আগামী কয়েক দিনের মধ্যে কমে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। তার ভাষায়, আগামী ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে দেশের গ্যাস পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হবে।
পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস নেওয়ার অভিযোগ
গ্যাসসংকটের মধ্যেই একটি অসাধু চক্র পাইপলাইন থেকে অবৈধভাবে গ্যাস টেনে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, কিছু ব্যক্তি বিদেশ থেকে আনা অথবা নিজেদের তৈরি যন্ত্র ব্যবহার করে পাইপলাইন থেকে জোর করে গ্যাস সংগ্রহ করছেন। এর ফলে ওই ব্যক্তিরা লাভবান হলেও আশপাশের বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্যাসের সংকটে পড়ছেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘করছে হয়তো পাঁচজন, কিন্তু কষ্ট পাচ্ছে ১০০ জন।’
অবৈধভাবে গ্যাস নেওয়া বন্ধ করতে শুধু সরকারের উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে সাধারণ মানুষকেও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তারেক রহমান বলেন, ‘দেশটা আমাদের সবার। প্রত্যেকটা মানুষ দেশের একজন অংশীদার। এই দেশের প্রতি দায়িত্ব সবার আছে।’
কেউ অবৈধভাবে গ্যাস বা বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে কিংবা রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি হতে দেখলে তার প্রতিবাদ করার আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর দেশের প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
গ্যাস অনুসন্ধানে ১৩০ কূপ খননের উদ্যোগ
দেশের ভূগর্ভে গ্যাসের মজুত থাকার কথা বলা হলেও এর প্রকৃত পরিমাণ ও অবস্থান এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি বলে জানান তারেক রহমান। সম্প্রতি সংসদেও এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তারেক রহমানের অভিযোগ, গত ১৭ বছরে দেশের জ্বালানি খাতকে ব্যাপকভাবে বিদেশ-নির্ভর করে তোলা হয়েছিল। একই সময়ে রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে কার্যকরভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমাদের সরকারের যে বাপেক্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের কাজ হচ্ছে যে বাংলাদেশে কোথায় গ্যাস আছে, কোথায় তেল আছে এগুলোর অনুসন্ধান করা, এই বাপেক্সকে সম্পূর্ণভাবে তারা পঙ্গু করে রেখে দিয়েছিল এবং বিভিন্নভাবে তারা বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখানে সুযোগ দিয়েছিল।’
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাপেক্সকে আবার সক্রিয় করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
গ্যাস অনুসন্ধানের অনিশ্চয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপনের উদাহরণ দেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, কোনো এলাকায় খনন করলেই যেমন নিশ্চিতভাবে পানি পাওয়া যায় না, তেমনি গ্যাসের কূপ খনন করলেই সেখানে গ্যাস পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই। এর সঙ্গে কূপ খননের বিপুল ব্যয়ের বিষয়টিও রয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, ‘কাজেই আমরা ১৩০টা গ্যাসকূপ অনুসন্ধানের চেষ্টা করছি, এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা আশাবাদী, অনেকগুলোতেই গ্যাস পাব। যখন গ্যাস পাব, স্বাভাবিকভাবেই অবস্থার অবশ্যই উন্নতি হবে।’
ঢাকা-১৭ নিয়ে দুঃখ প্রকাশ, ফ্যামিলি কার্ডের অগ্রগতি
বক্তব্যের শুরুতে ঢাকা-১৭ নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের উদ্দেশেও কথা বলেন তারেক রহমান। নির্বাচনের পর এলাকার মানুষকে যতটা সময় দেওয়া প্রয়োজন ছিল, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের কারণে তা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকার বিভিন্ন সমস্যাগুলো অ্যাড্রেস করার জন্য, এলাকার মানুষের বিভিন্ন সুবিধা-অসুবিধাগুলো, বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ যারা আছেন তাদের সুবিধা-অসুবিধাগুলো যতটুকু সম্ভব রাষ্ট্রীয় অবস্থান থেকে নিশ্চিত করার জন্য।’
ঢাকা-১৭ থেকেই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলট প্রকল্প শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। এ প্রকল্পের কাজ শেষ করতে আরও এক থেকে দেড় মাস সময় লাগতে পারে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘এর কাজ শেষ হতে আরও এক থেকে দেড় মাস সময় লাগতে পারে।’