
জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশে রাজনৈতিক তৎপরতা জোরদার হলেও নির্বাচন আদৌ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে কিনা—এ নিয়ে জনমনে সংশয় বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও উপস্থাপক জিল্লুর রহমান বলেছেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে—এই ভোট সত্যিকারের নির্বাচন হবে, নাকি আগের মতো আবারও নিয়ন্ত্রিত বা সাজানো প্রক্রিয়ায় রূপ নেবে।
সম্প্রতি নিজের ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত এক ভিডিওতে তিনি এসব মন্তব্য করেন। জিল্লুর রহমান জানান, আগামী ২২ তারিখ থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ২১ তারিখের মধ্যেই প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তার মতে, নির্বাচনের দিনক্ষণ যত কাছাকাছি আসছে, ততই মানুষের মনে প্রশ্ন বাড়ছে—এই নির্বাচন শেষ পর্যন্ত হবে তো? হলে কী পরিস্থিতিতে হবে এবং কী মূল্য দিয়ে হবে?
তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনী সমীকরণকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে একটি বড় রাজনৈতিক দল ও তাদের মিত্রদের অনুপস্থিতি। তাদের বিপুল ভোটব্যাংক শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যাবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। কেউ বলছেন, ভোটাররা নিরুৎসাহিত হয়ে ভোটকেন্দ্রেই যাবেন না; আবার কেউ মনে করছেন, এই ভোট নতুন কোনো রাজনৈতিক শক্তির দিকে যেতে পারে। তবে বাস্তবতায় সাধারণ ভোটারের কাছে জোট-মিত্রের হিসাব নয়, বরং দল ও প্রতীকই মুখ্য থাকে—এ কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
জিল্লুর রহমান বলেন, “বিএনপি মানে বিএনপি, আওয়ামী লীগ মানে আওয়ামী লীগ”—এই বাস্তবতার বাইরে জোট-মিত্র নিয়ে হিসাব সাধারণ ভোটারদের আচরণে খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। তবে এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা—তারা কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই বড় প্রশ্ন।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পরিস্থিতি কখনোই পুরোপুরি স্থিতিশীল ছিল না; বরং অভ্যুত্থানের পর থেকে আইন-শৃঙ্খলা আরও অবনতির দিকে গেছে। প্রতিদিন কোথাও না কোথাও হত্যাকাণ্ড ঘটছে, যার সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাও দেখা যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হলে এই সহিংসতা কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে—এ নিয়েও জনমনে উৎকণ্ঠা রয়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তন কিংবা নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হলে দুর্বৃত্ত ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের তৎপরতা বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়েও বিশ্লেষণ করেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের পর থেকে দলটির সাংগঠনিক শক্তি, মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বেড়েছে। তার মতে, জামায়াতে ইসলামী খুবই কৌশলী দল এবং তারা পরিস্থিতিকে নিজেদের মতো করে পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, “আমরা দেখেছি—ছাত্রশিবির কিভাবে ছাত্রলীগের ভেতরে ঢুকে একটার পর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়ী হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, তাদের কোনো লজ্জাবোধও নেই—তারা প্রকাশ্যেই বলছে, আমরা ছাত্রলীগ করেছি, এখন শিবির।”
এনসিপি নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি। জিল্লুর রহমান বলেন, বাস্তবে এনসিপির ভোটসমর্থন কতটা—তা স্পষ্ট নয়, তবে রাজনৈতিক ও সরকারি পরিসরে দলটির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেখা যাচ্ছে। এনসিপির একাধিক নেতার বক্তব্যে এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে যে তারা বিপুলসংখ্যক আসনে জয় পেতে পারেন। এতে অনেকের আশঙ্কা, নির্বাচন শেষ পর্যন্ত হলেও সেটি সরকারের অধীনে একটি ‘ইঞ্জিনিয়ার্ড’ বা সাজানো নির্বাচনে পরিণত হতে পারে, যেখানে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা সুবিধা পেতে পারে। তবে ইসলামী আন্দোলন এই ধারার বাইরে অবস্থান নেওয়ায় কেউ কেউ সামান্য স্বস্তি পাচ্ছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সরকারের ভূমিকা ও অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন বা সরকার জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো বার্তা না দিলেও গণভোট নিয়ে তাদের তৎপরতা বেশি চোখে পড়ছে। উপদেষ্টাদের জেলা সফর, এনজিওদের ডেকে ক্যাম্পেইন নিয়ে নির্দেশনা দেওয়া এবং প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা দেখে অনেকের ধারণা—সরকার কোন পথে এগোতে চায়, তা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। ফলে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হবে কিনা, হলে কীভাবে হবে—এসব প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠছে।