
বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়ছে। শুরুতে যেখানে বিএনপির নিরঙ্কুশ সুবিধাজনক অবস্থান নিয়ে আলোচনা চলছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই হিসাব ক্রমেই জটিল হয়ে উঠেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরাসরি মাঠে না থাকায় বিএনপি কিছুটা স্বস্তি পেলেও, দ্রুত সংগঠিত হয়ে ওঠা জামায়াতে ইসলামীর উত্থান দলটির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের প্রভাব বৃদ্ধি, সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনগুলোতে তাদের সাফল্য এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় উপস্থিতি বিএনপির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। ফলে ভোটের সমীকরণে বিএনপি এগিয়ে থাকলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পথ যে মোটেও সহজ নয়, তা দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে।
এই নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে মধ্য-ডানপন্থি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং কট্টর ডানপন্থি জামায়াত নেতৃত্বাধীন ইসলামপন্থি জোটের মধ্যে। একসময় এই দুই দল রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে একসঙ্গে নির্বাচন করেছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে বিএনপি সরকারের সময় জামায়াতের নেতারা মন্ত্রিসভায়ও ছিলেন।
দীর্ঘদিন শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের প্রতি অভিন্ন বিরোধিতা বিএনপি ও জামায়াতকে কাছাকাছি রেখেছিল। তবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়ে রাজনীতির মূল স্রোত থেকে সরে যাওয়ার পর সেই সম্পর্কের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে। গত এক বছরে সংবিধান সংস্কার ও নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে দুই দলের মতপার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে এবং ক্ষমতার লড়াই যত তীব্র হচ্ছে, তাদের দূরত্ব ততই বাড়ছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে দেশের ৩০০টি আসনে ভোট হবে। শুরু থেকেই বিএনপিকে এগিয়ে ধরা হচ্ছিল। কয়েক দশক ধরে দলটির সমর্থনভিত্তি মোটামুটি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দমন-পীড়নের কারণে বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। সে সময় দলের চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কারাবন্দী ও অসুস্থ ছিলেন, আর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যুক্তরাজ্যে অবস্থান করায় মাঠের রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন।
আওয়ামী লীগ পতনের পর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে বিএনপির কিছু নেতা-কর্মীর আচরণ দলটির ভাবমূর্তিতে আঘাত হানে। লুটপাট ও সহিংসতার ঘটনায় জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তবে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা জাগায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও ইতিবাচক সাড়া পড়ে। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেওয়ার পর বড় কোনো বিভক্তি দেখা যায়নি; বরং দল নতুন গতি পেয়েছে।
দেশে ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই খালেদা জিয়ার মৃত্যু ঘটে। তার মৃত্যু তারেক রহমান ও বিএনপির প্রতি সহানুভূতির আবহ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা নির্বাচনে দলটির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবু বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জামায়াতের ক্রমবর্ধমান শক্তি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতসহ কয়েকটি ইসলামপন্থি সংগঠন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং ‘ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধে’ জড়িত ছিল। এ কারণে দীর্ঘদিন দলটিকে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হয়েছে। শক্তিশালী তৃণমূল নেটওয়ার্ক ও রাজপথের উপস্থিতি থাকলেও অতীতে জামায়াত বড় ধরনের নির্বাচনী সাফল্য পায়নি।
তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতে পারে। সাম্প্রতিক কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভালো ফল করেছে জামায়াত। শহুরে তরুণদের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। পরিবর্তন ও সুশাসনের প্রত্যাশায় থাকা কিছু ভোটারের কাছে দলটি নতুন বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে।
এদিকে আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও তাদের কিছু নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের ভোটভিত্তিও ছিল ৩০ থেকে ৪০ শতাংশের মধ্যে। শেখ হাসিনার পতনের পর তা কিছুটা কমলেও এই সমর্থন এখনো বড় ফ্যাক্টর। এই ভোটাররা কোন পথে যাবেন, তা ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ ধর্মীয় সংখ্যালঘু। অতীতে তারা মূলত আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন। এবার বিএনপি ও জামায়াত— উভয় দলই এই ভোটব্যাংকের দিকে নজর দিচ্ছে। হিন্দু ভোটারদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা দুই পক্ষ থেকেই ‘ভয়ভীতি ও চাপের’ মুখে পড়ছেন। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সমর্থকদের টানতে বিএনপি ও জামায়াত— দুই দলই নিজেদের ভাবমূর্তি বদলানোর চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশে ফেরার পর প্রথম জনসভায় তারেক রহমান একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের কথা বলেন, যেখানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরও জায়গা থাকবে। জামায়াতের নাম না নিয়ে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ‘১৯৭১ সালে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তারা (জামায়াত) ‘লাখ লাখ মানুষ হত্যা করেছিল’।’ অন্যদিকে জামায়াত তাদের স্বাধীনতাবিরোধী ও রক্ষণশীল ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে তারা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি)-কে জোটে অন্তর্ভুক্ত করেছে।
এলডিপির নেতা কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। জামায়াত আশা করছে, তার অন্তর্ভুক্তিতে ১৯৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে তৈরি নেতিবাচক ধারণা কিছুটা হলেও কাটবে। অপরদিকে, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা এনসিপি তরুণ ভোটারদের আকর্ষণ করবে বলে ধারণা থাকলেও, দলের ভেতরের বিভাজনে সেই সম্ভাবনা কমে গেছে।
আওয়ামী লীগ সমর্থক ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু ভোটারদের সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করবে তারা অতীত ভুলে যেতে রাজি কি না তার ওপর। জামায়াত দাবি করছে, তারা সংখ্যালঘু বা নারী-বিরোধী নয়। তবে তাদের প্রার্থী তালিকায় মাত্র একজন হিন্দু প্রার্থী এবং কোনো নারী প্রার্থী না থাকায় সেই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক দেখা যাচ্ছে।
বিএনপির ক্ষেত্রেও প্রশ্ন রয়েছে। তারেক রহমান এখন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মধ্যপন্থি রাজনীতির কথা বললেও, তার উদ্যোগেই অতীতে জামায়াতের সঙ্গে জোট হয়েছিল বলে ধারণা রয়েছে। খালেদা জিয়া ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা সেই জোট নিয়ে ‘অস্বস্তিতে’ ছিলেন বলেও আলোচনা রয়েছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপি মাত্র দুজন হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা এখন ভাবছেন, বিএনপি না জামায়াত— ভবিষ্যতের জন্য কে তুলনামূলক ভালো বিকল্প। বিএনপির ‘নতুন ভিশন’ দলটিকে কিছুটা এগিয়ে রাখলেও, আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতা ভুলে যাওয়া তাদের জন্য সহজ হবে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। দীর্ঘ সময় ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ একে অপরের সরকার অচল করেছে, রাজপথ ও নির্বাচনে সংঘাতে জড়িয়েছে। এবার সেই আওয়ামী লীগ সমর্থকরাই নির্বাচনের ফল ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখছেন। ভোটের দিনে তারা কোন পথে যাবেন, সেটিই ঠিক করে দিতে পারে আগামী সরকারের ভবিষ্যৎ।
দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত এই নিবন্ধটি লিখেছেন সুধা রামচন্দ্রন। বেঙ্গালুরুতে বসবাসরত এই সাংবাদিক ম্যাগাজিনটির দক্ষিণ এশিয়া সম্পাদক। তিনি নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেছেন।