
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎ নতুন করে ঝড় উঠেছে। সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ এবং কোলকাতা-ভিত্তিক ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’কে দেওয়া শেখ হাসিনার একটি ইমেইল সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে এই আলোচনার সূত্রপাত।
যেখানে শেখ হাসিনা জোর দিয়ে বলেছেন, "আমি খুব শিগগিরই বাংলাদেশের মাটিতে মাথা উঁচু করে ফিরে আসব।" তবে এই প্রত্যাবর্তনের পথ কতটা বাস্তবসম্মত, আর আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতাই বা কতখানি—তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
হঠাৎ আলোচনার নেপথ্যে কী?
শেখ হাসিনার দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের নীরবতা ভেঙে হঠাৎ এই রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে: সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে তাঁর প্রথম স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, তাঁর অনুপস্থিতির অর্থ নীরবতা নয়। তিনি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার নিয়ে দ্রুত দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের তৎপরতা: ভোটের রাজনীতিতে প্রত্যাখ্যাত না হয়ে দলটির কার্যক্রম নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ হওয়ায় তৃণমূল সমর্থকদের একাংশ এখনো সক্রিয় রয়েছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল এবং কক্সবাজারের পৌনে দুইশো আইনজীবীর জাতিসংঘের কাছে আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি এই আলোচনাকে উস্কে দিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টার মন্তব্য: অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের একটি সাম্প্রতিক ফেসবুক পোস্ট পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করেছে। তিনি দাবি করেন, সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু আমলা ও স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে ‘লীগ অনেক আগেই ব্যাক করেছে’।
ফেরার পথে পাহাড়সম আইনি বাধা
রাজনীতিতে ফেরার ঘোষণা দিলেও শেখ হাসিনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো দেশের প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়, চব্বিশের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতিমধ্যেই শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতির মামলা ও সাজা রয়েছে।
আত্মসমর্পণের বাধ্যবাধকতা:
আইন অনুযায়ী, দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি হিসেবে দেশে ফিরলে তাঁকে যেকোনো ফ্লাইটে নামার পরপরই গ্রেপ্তার করা হবে অথবা তাঁকে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হবে। রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে তিনি আপিল করার আইনি অধিকারও হারাবেন।
সরকারের অনড় অবস্থান ও প্রত্যর্পণ নীতি
শেখ হাসিনার ফেরার এই আলোচনাকে স্বাগত জানালেও বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকার বিষয়টিকে সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে দেখছে।"আমরা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই শেখ হাসিনাকে ফেরত চাই। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতের কাছে এক্সট্রাডিশন (প্রত্যর্পণ) চুক্তি অনুসারে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হয়েছে। তিনি যদি বলেন আসতে চান, তবে আমরা তো তাঁকে চাচ্ছিই- যাতে তিনি দেশে এসে আদালতের মুখোমুখি হন।" সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীএকই সুর শোনা গেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ড. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, "কারও যদি সাহস থাকে, তবে তাঁর উচিত ট্রাইব্যুনালে এসে আইনের মুখোমুখি হওয়া। আদালত খালাস দিলে কোনো সমস্যা নেই, তবে আগে বিচার প্রক্রিয়া ফেস করতে হবে।
পর্দার আড়ালে কি কোনো কূটনৈতিক সমীকরণ চলছে?
বিবিসি বাংলার সাবেক প্রধান সাবির মুস্তাফার মতো অভিজ্ঞ বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা যখন নির্দিষ্ট করে বা আত্মবিশ্বাসের সাথে ফেরার কথা বলছেন, তখন তা এমনি এমনি নয়। এর পেছনে হয়তো ঢাকা ও নতুন দিল্লির মধ্যে কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড বা পর্দার আড়ালের আলোচনা চলছে।তবে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। গত মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নতুন দিল্লি সফরকালে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরলেও, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে- তাঁকে ফেরত পাঠানো নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকারের অবস্থান:
আওয়ামী লীগ (আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম): তারা এই ট্রাইব্যুনালকে "বেআইনি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত" দাবি করে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পরের সব রায় (শেখ হাসিনার ফাঁসির আদেশসহ) বাতিলের দাবি জানিয়েছে।
বিএনপি (রুহুল কবির রিজভী): আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাতিলের কোনো সিদ্ধান্ত সরকারের নেই। শেখ হাসিনা যদি বিচার মোকাবিলা করতে চান, তবে তিনি যেকোনো ফ্লাইটে দেশে আসতে পারেন।
সরকার (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ): সরকার প্রত্যর্পণ (Extradition) চুক্তির আওতায় ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চেয়েছে, যাতে তিনি দেশে এসে মামলার মুখোমুখি হন।
জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি: তারা মনে করে, ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে দেশকে সংকটে ফেলার কারণে জনগণ তাদের গ্রহণ করবে না। রাজনীতিতে ফিরতে হলে আগে তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এবং আদালতের রায়ের ওপরই তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরা এখন আর কেবল তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি একদিকে যেমন তাঁর বিরুদ্ধে থাকা ফাঁসির রায় ও আইনি আত্মসমর্পণের বিষয়, অন্যদিকে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক জটিল কূটনৈতিক পরীক্ষা। শেষ পর্যন্ত পর্দার আড়ালের রাজনীতি কোন দিকে মোড় নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এই আলোচনার ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি।
বিবিসি