
পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছে অস্ত্র সরবরাহের পথ ও উৎস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। তিনি বলেছেন, পাহাড়ে তিনটি রুট দিয়ে অস্ত্র প্রবেশ করছে। এ বিষয়ে দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখনই সচেতন না হলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে হতে পারে।
বুধবার (১২ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক্স-ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ষড়যন্ত্র সার্বভৌমত্বের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
নুর বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আরাকান আর্মির কাছ থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করছে। তাদের কাছে উজি পিস্তলসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। ইসরায়েলের অস্ত্র উৎপাদন ও দেশটির সঙ্গে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন ও ভারতকে ঘিরে ইসরায়েল ও ভারতের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের কৌশলগত গুরুত্ব শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান উপলব্ধি করেছিলেন বলে মন্তব্য করেন নুরুল হক নুর।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ওই অঞ্চলের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য বজায় রাখা এবং প্রয়োজনীয় কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। তার নেওয়া নীতির কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রাম এখনো বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সঙ্গে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
নুর আরও বলেন, ১৯৭২ সাল থেকেই বাংলাদেশের কোনো কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে থাকায় সেখানে ভারী অস্ত্র, মেশিনগানসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম কীভাবে পৌঁছায় এবং কারা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রশিক্ষণ দেয়—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তার ভাষায়, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা কিংবা নেপালের পক্ষে সেখানে গিয়ে অস্ত্র সরবরাহ বা প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দমনে কঠোর সামরিক অভিযান পরিচালনার দাবি জানানো হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন নুর।
এ সময় জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। তার দাবি, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ভারতের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় ছিল এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ভারতের একটি ‘ব্লুপ্রিন্ট’ ছিল।
দেশের সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, এসব সংস্থার কাজ হলো দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে এমন বিষয়গুলো শনাক্ত করা। তবে অনেক সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে জাতীয় স্বার্থের পরিবর্তে রাজনৈতিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ধরনের প্রবণতা দেশের জন্য বিপজ্জনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে।
দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বিরোধী শক্তির মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানিয়ে নুর বলেন, গত ১৭ বছরে দেশের মানুষ দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকট ও দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে গেছে। ভবিষ্যতে আবার কোনো বড় সংকট তৈরি হলে তা মোকাবিলায় ঐক্য ছাড়া কার্যকর সমাধান পাওয়া কঠিন হবে।
প্রতিবেশী একটি দেশ বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল ও অকার্যকর রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার অভিযোগ, নিজেদের স্বার্থে ওই দেশটি কখনো সরকারকে ক্ষমতায় বসানো এবং কখনো সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা করে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের দাবি নিয়েও বক্তব্য দেন নুর। তিনি বলেন, পাহাড়ে দায়িত্ব পালনরত সেনাসদস্যরা কোনো আরামদায়ক অবস্থানে নেই; প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষায় তারা দায়িত্ব পালন করছেন।
সেনাবাহিনীকে পাহাড় থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি ‘ইনটেনশনাল’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সবশেষে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন নুরুল হক নুর। তিনি বলেন, পাহাড়ি ও সমতলের মানুষ—ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কিংবা বাঙালি—সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। দেশের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরই মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।