
আওয়ামী লীগ দিল্লির রাজনৈতিক প্রভাবের সম্প্রসারিত রূপ হিসেবে বাংলাদেশকে শোষণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আর সি মজুমদার অডিটোরিয়ামে শহীদ আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাৎ বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘আবরার ফাহাদ: দিল্লির আধিপত্যবাদ প্রসঙ্গ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
আখতার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে দিল্লির আধিপত্যবাদ সবচেয়ে কঠিনতম একটা শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এই বাংলাদেশের বিগত ১৭ বছরের রাজনীতি যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখব যে রাজনীতিটা পুরোমাত্রায় ছিল একটা দিল্লির এক্সটেনশন। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতায় ছিল সত্য। কিন্তু আওয়ামী লীগ আসলে দিল্লির এক্সটেনশন হিসেবে বাংলাদেশকে শোষণ করছিল।’
আবরারকে হত্যার কারণ নিয়ে প্রশ্ন
শহীদ আবরার ফাহাদের হত্যার প্রসঙ্গ টেনে এনসিপির সদস্যসচিব প্রশ্ন তোলেন, আবরার ফাহাদের অপরাধ কী ছিল এবং কেন তাকে হত্যা করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, আবরার বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে কথা বলেছিলেন। ফেসবুকে দেওয়া তাঁর স্ট্যাটাসে বাংলাদেশের নদী, পানি ও ন্যায্য হিস্যার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছিল।
আখতার হোসেনের ভাষ্য, ভারতের কাবেরী নদীর পানি নিয়ে কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুর মানুষের মধ্যে বিরোধের উদাহরণ টেনে আবরার প্রশ্ন তুলেছিলেন—একই দেশের দুটি পক্ষ নিজেদের স্বার্থের প্রশ্নে ছাড় না দিলে বাংলাদেশ কেন অভিন্ন নদীগুলোর পানির ক্ষেত্রে ভারতকে ছাড় দেবে?
তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে আবরারের এই অবস্থানের কারণেই তাকে রাতভর নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, আবরার এখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
আখতার হোসেন বলেন, ‘আবরার ফাহাদ দিল্লির আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এই বাংলাদেশের একজন মূর্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছেন, যিনি সাহস করে সেই সময়টাতে কথাগুলো বলতে পেরেছিলেন।’
শেখ হাসিনা ও ভারত প্রসঙ্গে বক্তব্য
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে আখতার হোসেন বলেন, ‘ভারতকে যা দিয়েছে, সেটা ভারত আজীবন মনে রাখবে’—শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের প্রতিফলন পরবর্তী সময়েও দেখা গেছে বলে তিনি দাবি করেন।
তাঁর অভিযোগ, বাংলাদেশে গুম, খুন, নির্যাতন ও নিপীড়নের অভিযোগ এবং জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পরও ভারত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা এ কথাটা বলে যে, ভারতকে যা দিয়েছে, সেটা ভারত আজীবন মনে রাখবে। ভারতবর্ষ সেটা মনেও রেখেছে। এই বাংলাদেশে হাজার হাজার গুম, খুন, অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন করার পরেও, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কালে একটা নারকীয় গণহত্যা বাংলাদেশের মানুষের উপরে চাপিয়ে দেওয়ার পরেও তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে রেখেছে।’
ভারতের পুশ ইন চেষ্টা প্রসঙ্গে
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে নাগরিকত্বসংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আখতার হোসেন। তাঁর দাবি, শুধু বাংলায় কথা বলা কিংবা মুসলমান হওয়ার কারণে ভারতের অনেক মানুষকে নাগরিকত্বহীন করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, ‘একজন সাধারণ মানুষকে নাগরিকত্বহীন করা যায় না, তার অধিকারকে হরণ করা যায় না। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, আসামে অনেক মানুষকে তারা নাগরিকত্বহীন করে ফেলেছে। তাদেরই দেশের মানুষ, কিন্তু শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলে, মুসলমান এ কারণেই নাগরিকত্বহীন করে দেওয়া হচ্ছে।’
এ ধরনের পরিস্থিতিকে তিনি একটি ‘চক্রান্ত’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার মতো ভারতের নাগরিকদেরও নাগরিকত্বহীন করে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা বিভিন্ন সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
আখতার হোসেনের ভাষ্য, বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও এ বিষয়ে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীগুলোকেও ভারতে যে মানুষটাকে নাগরিকত্বহীন করে দেওয়া হচ্ছে, যার ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, সেই মানুষটার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। কারণ বাংলাদেশ এটাতে অ্যাফেক্টেড হওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে।’
ভারতে কোনো সাধারণ মানুষের নাগরিকত্ব ও অধিকার যেন কেড়ে নেওয়া না হয়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোকে উদ্বেগ প্রকাশ করার আহ্বান জানান তিনি।