
চারটি বিশ্বকাপ, অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত আর একটি জাতির স্বপ্নকে দীর্ঘদিন ধরে বয়ে নেওয়ার গল্পের নাম লুকা মদ্রিচ। ২০২৬ বিশ্বকাপের মাধ্যমে শেষ হলো ক্রোয়েশিয়ার এই কিংবদন্তি মিডফিল্ডারের বিশ্বকাপ অধ্যায়।
পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর ম্যাচে ২-১ গোলের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় ক্রোয়েশিয়া। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের মঞ্চেও শেষবারের মতো দেখা যায় ৪০ বছর বয়সী মদ্রিচকে।
তবে তার গল্প কেবল একজন ফুটবলারের নয়। এটি যুদ্ধবিধ্বস্ত শৈশব পেরিয়ে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের কাতারে উঠে আসা এক অনন্য সংগ্রামের কাহিনি।
মাঝমাঠে খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণ গড়ে তোলা কিংবা কঠিন মুহূর্তে নেতৃত্ব দেওয়া—এই গুণগুলোর কারণেই মদ্রিচ ছিলেন অনন্য। তার অবদানকে কখনোই শুধুমাত্র গোল বা পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যায় না।
১৯৮৫ সালে ক্রোয়েশিয়ার মোদ্রিচি গ্রামে জন্ম নেওয়া এই ফুটবলারের শৈশব কেটেছে যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে। দেশটির স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পরিবারকে বাড়িঘর ছেড়ে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে হয়েছিল একটি হোটেলে। সেই হোটেলের আশপাশের খোলা জায়গায় ফুটবল খেলেই নিজের স্বপ্নটিকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন ছোট্ট মদ্রিচ।
যুদ্ধ তার কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছিল, কিন্তু ফুটবল কেড়ে নিতে পারেনি।
পরবর্তীতে ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন ইংল্যান্ডের টটেনহ্যাম হটস্পারে। ক্লাবটির হয়ে ১২৭ ম্যাচে ১৩ গোল করেন তিনি। এরপর রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়ে ক্যারিয়ারকে নিয়ে যান নতুন উচ্চতায়। স্প্যানিশ জায়ান্টদের হয়ে ৩৯৪ ম্যাচে তার গোল ৩০টি। আর জাতীয় দলের জার্সিতে ২০১ ম্যাচে করেছেন ২৯ গোল।
তবে সংখ্যার চেয়েও বড় ছিল তার প্রভাব। খেলার গতি নির্ধারণ, বলের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের সূচনা কিংবা সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি—সব ক্ষেত্রেই মদ্রিচ ছিলেন নির্ভরতার প্রতীক।
তার অসাধারণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ইএসপিএনের বর্ষসেরা মিডফিল্ডার নির্বাচিত হন তিনি। উয়েফার বর্ষসেরা মিডফিল্ডারের পুরস্কারও জিতেছেন একাধিকবার। ২০১৭ সালে ক্লাব বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতিও অর্জন করেন।
তবে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়েও বড় হয়ে থাকবে জাতীয় দলের হয়ে তার অবদান।
২০১৮ সালের বিশ্বকাপে মদ্রিচের নেতৃত্বেই ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফাইনালে ওঠে ক্রোয়েশিয়া। শিরোপা না জিতলেও পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য জেতেন গোল্ডেন বল। একই বছর মেসি ও রোনালদোর দীর্ঘদিনের আধিপত্য ভেঙে নিজের করে নেন ব্যালন ডি'অর।
২০২২ বিশ্বকাপেও বয়সকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দলকে সেমিফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা এবং অসাধারণ দক্ষতায় আবারও প্রমাণ করেছিলেন, বয়স কেবল একটি সংখ্যা।
কাতার বিশ্বকাপের পর আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার আলোচনা উঠলেও দেশের প্রয়োজনেই জাতীয় দলে থেকে যান মদ্রিচ। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মুখ।
অবশেষে পর্তুগালের বিপক্ষে হারের মধ্য দিয়ে শেষ হয় তার বিশ্বকাপ যাত্রা। কিন্তু বিশ্বকাপ মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেও ফুটবল ইতিহাসে তার নাম থেকে যাবে উজ্জ্বল অক্ষরে।
কারণ লুকা মদ্রিচ শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি এমন এক নেতা, যিনি একটি ছোট দেশকে বারবার বিশ্ব ফুটবলের বড় মঞ্চে আলোচনায় নিয়ে এসেছেন।
মাঠের বাইরেও তার বিনয়, শান্ত স্বভাব ও পেশাদার মনোভাব তাকে আলাদা করেছে অন্যদের থেকে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার চেয়ে নিজের কাজ দিয়েই পরিচিত হতে চেয়েছেন তিনি। আর সেখানেই হয়তো লুকা মদ্রিচের সবচেয়ে বড় সাফল্য।