
বিশ্বকাপের মহোৎসবের শিরোপা নির্ধারণী মঞ্চে আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার অপেক্ষা। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বসতে যাওয়া মেগা ফাইনালে গ্যালারিতে বিশ্বনেতা ও হাইপ্রোফাইল বিশিষ্ট অতিথিদের চাঁদের হাট বসলেও, সেখানে দেখা যাবে না আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইকে। তবে ট্রফি জয়ের এত কাছাকাছি গিয়েও তাঁর এই ঐতিহাসিক ম্যাচে না যাওয়ার পেছনে কোনো রাজনৈতিক বিরোধ বা কূটনৈতিক টানাপোড়েন নেই; বরং এর পেছনে রয়েছে দেশটির ফুটবল সংস্কৃতির সাথে জড়িয়ে থাকা এক অদ্ভুত ও আদিম অন্ধবিশ্বাস!
চলতি বিশ্বকাপে আলবিসেলেস্তেদের প্রতিটি ম্যাচই মিলেই নিজের অফিশিয়াল বাসভবন ‘কিন্তা দে অলিভোস’ থেকে টেলিভিশনের পর্দায় উপভোগ করেছেন। ফাইনাল ম্যাচেও তিনি তাঁর সেই চেনা রুটিন ও কুসংস্কারের বেড়াজাল ভাঙতে নারাজ।
সম্প্রতি বুয়েনস আইরেসভিত্তিক জনপ্রিয় রেডিও স্টেশন ‘এল অবজারভাদর’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট মিলেই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, অতীতের অন্য সব ম্যাচের মতোই ফাইনাল ম্যাচটিও তিনি তাঁর অলিভোসের বাসভবন থেকেই দেখবেন। এ সময় তিনি টুর্নামেন্টে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের একটি মজার ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন:
"ম্যাচ চলাকালে তিনি একটি তেল কোম্পানির লোগোযুক্ত জ্যাকেট পরে খেলা দেখছিলেন। বাইরে ঠান্ডা আবহাওয়া থাকলেও তিনি সাধারণত ঘরে হিটার ব্যবহার করেন না। একপর্যায়ে গরম লাগায় জ্যাকেটটি খুলে ফেলেন। ঠিক তখনই সুইজারল্যান্ড গোল করে বসে। এরপর তিনি আবার জ্যাকেটটি পরে নেন এবং সিদ্ধান্ত নেন, ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর এটি খুলবেন না।"
তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, ওই নির্দিষ্ট জ্যাকেটটি গায়ে রাখা এবং ম্যাচের প্রথম দিন থেকে একই রুটিন কঠোরভাবে মেনে চলার কারণেই লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা একের পর এক ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠেছে।
১৯৯০ সাল ও 'মুফা' নামক অলিখিত আতঙ্ক
আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রপ্রধানদের বিশ্বকাপ মাঠে সশরীরে উপস্থিত না হওয়ার এই প্রথার পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও বিতর্কিত ইতিহাস। দেশটিতে কোনো ব্যক্তি বা ঘটনাকে অমঙ্গলের বা অপয়া ভাবার বিশ্বাসকে বলা হয় ‘মুফা’। এর জন্ম হয়েছিল ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে। সেই আসরে উদ্বোধনী ম্যাচের ঠিক আগে তৎকালীন আর্জেন্টাইন প্রেসিডেন্ট কার্লোস মেনেম ডিয়েগো ম্যারাডোনাদের জাতীয় দলের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছিলেন। কিন্তু এর পরপরই পুঁচকে ক্যামেরুনের কাছে ১-০ গোলে হেরে স্তব্ধ হয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ব্যস, এরপর থেকেই উগ্র সমর্থকরা কার্লোস মেনেমকে ‘মুফা’ বা দুর্ভাগ্যের প্রতীক হিসেবে তকমা দিয়ে বসেন।
সেই ঐতিহাসিক ধাক্কার পর থেকে আজ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টই বিশ্বকাপের ম্যাচে গ্যালারিতে বসার সাহস দেখাননি। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিলেইও সেই ধারা ভাঙার কোনো ঝুঁকি নিতে চান না।
আর্জেন্টাইন ফুটবল সংস্কৃতির বিচিত্র রূপ
কেবল দেশের প্রেসিডেন্টই নন, ল্যাটিন আমেরিকার এই ফুটবলপাগল দেশটির কোটি কোটি সমর্থকের জীবনযাত্রার সাথেও মিশে আছে অদ্ভুত সব কুসংস্কার ও সংস্কার (যাকে তারা 'কাবালা' বলে থাকে)। কেউ কেউ প্রিয় দলের খেলা দেখার সময় পুরো এক মাস নিজের ব্যবহৃত জার্সি ধুয়ে পরিষ্কার করেন না। আবার কেউ কেউ প্রতিটি ম্যাচে ঘরের একটি নির্দিষ্ট সোফায় বসে কিংবা একই জুতো জোড়া পরে খেলা উপভোগ করেন।
এমনকি অনেক সমর্থক এমন বিশ্বাসেও অনড় থাকেন যে, কোনো ম্যাচে গোল হওয়ার মুহূর্তে তিনি যদি শৌচাগারে অবস্থান করেন, তবে পরবর্তী ম্যাচগুলোর গোল করার সময়েও তাঁকে বাথরুমেই কাটাতে হবে! এছাড়াও প্রতিপক্ষের শক্তি কমাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিপক্ষ দলের নাম কাগজে লিখে ডিপ ফ্রিজে রাখা, ম্যাচ শুরুর ঠিক নির্দিষ্ট সময়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করা কিংবা ম্যাচের দিন বিশেষ রুটিন মেনে চলা আর্জেন্টাইনদের কাছে অতি সাধারণ ও সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
রোববারের ফাইনালে মাঠের তীব্র লড়াইয়ের পাশাপাশি আর্জেন্টিনার ফুটবলপ্রেমীদের এই বিচিত্র ও রোমাঞ্চকর লোকবিশ্বাসগুলোও এখন পুরো বিশ্বজুড়ে নতুন করে এক দারুণ আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে।