
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অবস্থান আরও কঠোর করেছে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে তাকে অনাস্থা ভোটের মুখোমুখি করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
শনিবার (১ আগস্ট) উয়েফা জানায়, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ওপর তাদের আর আস্থা নেই। তাই তাকে অবিলম্বে দায়িত্ব ছাড়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
উয়েফার দাবি, ফিফা সভাপতিকে অপসারণের পক্ষে তাদের ৫৫টি সদস্য দেশই ভোট দেবে। অনাস্থা ভোট আহ্বানের জন্য যেখানে ৪৩টি সদস্য দেশের সমর্থন প্রয়োজন, সেখানে প্রয়োজনীয় সংখ্যার চেয়েও বেশি সমর্থন তাদের রয়েছে।
ফিফার শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে উয়েফা এক বিবৃতিতে বলেছে, পর্দার আড়ালে কিছু মানুষের তৈরি গোপন পরিকল্পনা এবং তা তড়িঘড়ি বাস্তবায়নের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এতে ফুটবলের প্রকৃত স্বার্থ কতটা রক্ষা হচ্ছে, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে। এ ঘটনার নেপথ্যে কারা রয়েছেন, তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। আগামী কয়েক দিন ও সপ্তাহে সদস্য অ্যাসোসিয়েশন ও অন্যান্য কনফেডারেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ২০১৬ সালে ফিফা সভাপতি নির্বাচনের আগে সদস্য সংগঠনগুলোর কাছে সমর্থন চাইতে গিয়ে ইনফান্তিনো বলেছিলেন, "ফিফার টাকা আপনাদেরই টাকা। এটা ফিফা সভাপতির পকেটের টাকা নয়। আপনারা জাতীয় অ্যাসোসিয়েশন, তাই ফিফার অর্থ কেবল ফুটবলের উন্নয়নের কাজেই ব্যবহার করতে হবে, অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়।" উয়েফার অভিযোগ, তিনি এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। সংস্থাটির মতে, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং তা জোরপূর্বক বাস্তবায়নের চেষ্টা ফুটবলের স্বার্থবিরোধী। একই সঙ্গে ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রিজার্ভ তহবিল থাকা সত্ত্বেও সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর উন্নয়নে সেই অর্থ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়নি।
উয়েফা জানিয়েছে, বিদ্যমান ফিফা ফরোয়ার্ড কর্মসূচির আওতায় কীভাবে আরও কার্যকরভাবে অর্থ বণ্টন করা যায়, তা নিয়ে তারা এখনই বৈশ্বিক ফুটবল সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কাজ শুরু করবে। সংস্থাটির ভাষ্য, ফিফার ব্যাংক হিসাবের অলস পড়ে থাকা অর্থ সদস্যভুক্ত ২১১টি দেশের তৃণমূল ফুটবল ও সামগ্রিক উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত। তাদের মতে, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব বিক্রি না করেও এই উন্নয়ন সম্ভব।
উয়েফার অবস্থানকে প্রকাশ্যে সমর্থন দিয়েছে ইংল্যান্ডের দ্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। সংস্থাটি বলেছে, বিশ্ব ফুটবলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ফিফার নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ এবং কঠোর পর্যালোচনা জরুরি।
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের ৩০ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তরের পরিকল্পনা প্রকাশের পর থেকেই ইনফান্তিনো ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন। সমালোচকদের দাবি, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ফিফার শীর্ষ নারী ও পুরুষ ফুটবল প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ একদল বিনিয়োগকারীর হাতে চলে যেত।
উয়েফা অভিযোগ করে, ফিফা এই উদ্যোগের মাধ্যমে "ফুটবলের আত্মাকেই বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।" এর প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার উয়েফার ৫৫ সদস্য দেশ সর্বসম্মতিক্রমে ৫৫-০ ভোটে বিশ্বকাপ বয়কটের পক্ষে মত দেয়।
উয়েফার পর উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফও একই অবস্থান নেয়। যদিও শুক্রবার দিনের শুরুতে ফিফা দাবি করেছিল, তাদের পরিকল্পনা এগিয়ে যাবে এবং "ফুটবলকে বেচে দেওয়া হচ্ছে"— এমন অভিযোগও তারা প্রত্যাখ্যান করে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে যখন এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)ও এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে। সংস্থাটি জানায়, বিশ্বকাপের স্বার্থ রক্ষায় তারা উয়েফা ও কনকাকাফের সঙ্গে একযোগে কাজ করবে। এর ফলে ফিফার ২১১ সদস্য দেশের অর্ধেকের সমর্থনও জোগাড় করতে ব্যর্থ হন ইনফান্তিনো। শুক্রবার এ বিরোধ আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে।
বিশ্বকাপের অংশীদারিত্ব বিক্রির পরিকল্পনার প্রতিবাদে ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কোর্ডেইরো পদত্যাগ করেন। পরে ফিফার চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামুও অভিযোগ করেন, ইনফান্তিনো কর্মীদের সঙ্গে ‘প্রতারণা’ করেছেন।
রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও চাপ বাড়তে থাকে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইনফান্তিনোর পদত্যাগ দাবি করেন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এ পরিকল্পনা নিয়ে তার সঙ্গে ফিফা সভাপতির কোনো আলোচনা হয়নি।
এদিকে ফুটবল অঙ্গনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক কৌশলবিদ আশিষ প্রশাও উয়েফার পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, "নিজের পকেট ভারি করতে ফুটবলকে লুটপাট করে খেলাটির বারোটা বাজানোর প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছেন ইনফান্তিনো। একে শুধু থামালেই চলবে না, ভবিষ্যতে যেন এই নোংরা খেলা আর কখনও মাথাচাড়া দিতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।"