
রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চিরতরে মুছে যায়নি এবং দলটি দেশের আগামী সাধারণ নির্বাচনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে বলে এক চাঞ্চল্যকর পূর্বাভাস দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন। দেশের মানুষের স্মৃতিশক্তি খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী নয় মন্তব্য করে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, আওয়ামী লীগ আবারও দেশের মূলধারার রাজনীতিতে কামব্যাক করতে যাচ্ছে।
গণমাধ্যম যমুনা টেলিভিশনকে দেওয়া একটি বিশেষ ও এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে সাবেক এই শীর্ষ কূটনীতিক এসব বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।
উক্ত সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে নিজের দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের বিভিন্ন অজানা ও নাটকীয় অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খোলেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তিনি প্রকাশ করেন যে, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে অন্তত তিনবার তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে প্রতিবারই সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাঁকে বোঝানো হয়েছিল যে, সেই সংকটময় মুহূর্তে তাঁর পদত্যাগ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করবে।
বিগত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নেপথ্যে ‘ডিপস্টেট’ বা কোনো অদৃশ্য আন্তর্জাতিক শক্তির সক্রিয় যোগসাজশ ছিল কি না, উপস্থাপকের এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন ভূ-রাজনীতির চিরাচরিত সমীকরণ টেনে বলেন, বিশ্বের প্রতিটি ঘটনার পেছনেই কোনো না কোনোভাবে ডিপস্টেট জড়িত থাকে। তবে তারা কখনো স্রোতের বিপরীতে গিয়ে কাজ করে না, বরং স্রোতের অনুকূলে থেকে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বা ম্যানিপুলেট করার চেষ্টা করে।
সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্দরমহলে ‘কিচেন কেবিনেট’ বা প্রভাবশালীদের একটি গোপন ও শক্তিশালী বলয় সক্রিয় থাকার গুঞ্জন নিয়ে মুখ খোলেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তিনি জানান, কোনো একটি বিশেষ উপলক্ষে যমুনাতে আয়োজিত কিচেন ক্যাবিনেটের একটি বৈঠকে তাঁকে স্বশরীরে অংশ নিতে হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি সুনিশ্চিতভাবে জানতে পারেন যে, এই বিশেষ গ্রুপটি প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার নিয়মিত গোপন বৈঠকে মিলিত হতেন এবং সরকারের বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতেন। পর্দার আড়ালে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যে এমন একটি অদৃশ্য গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন ফিসফাস ও গুঞ্জন তাঁর কানেও আসত বলে তিনি অকপটে স্বীকার করেন।
জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়েও কথা বলেন তৌহিদ হোসেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট জানান, এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির প্রক্রিয়ার সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিন্দুমাত্র কোনো সম্পৃক্ততা বা মতামত ছিল না। পুরো বিষয়টি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অত্যন্ত গোপনে দেখভাল করেছিলেন। এর পেছনে হয়তো বিশেষ কোনো কারণ বা অলিখিত বাধ্যবাধকতা ছিল বলেই শেষ মুহূর্তে এই পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল। তবে কোনো নিরুপায় পরিস্থিতি না থাকলে এই স্পর্শকাতর চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত হতো বলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন।
বর্তমানে প্রতিবেশী দেশ ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত চেয়ে দিল্লির কাছে চিঠি পাঠানো প্রসঙ্গে সাবেক এই পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এক বাস্তবসম্মত মন্তব্য করেন। তিনি জানান, চিঠি দেওয়া হলেও ভারত যে এর কোনো ইতিবাচক জবাব দেবে না, তা তিনি আগে থেকেই খুব ভালো করে জানতেন। চিঠির কোনো উত্তর কেন আসেনি—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, আমরা কি আসলেই কোনো উত্তরের আশা করেছিলাম? তিনি নিজে দিল্লির কাছ থেকে এমন কোনো অবাস্তব প্রত্যাশা করেননি বলেই সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়ে দেন।