
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থাকে কাঁপিয়ে দেওয়া কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বহুল আলোচিত নারী চিকিৎসক ধর্ষণ ও হত্যা মামলা এবার সম্পূর্ণ নতুন এক মোড় নিল। চূড়ান্ত রায় হয়ে যাওয়ার পরও এই চাঞ্চল্যকর মামলার নতুন করে তদন্ত শুরুর ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্ট।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) আদালতের বিচারপতি শম্পা সরকার এবং বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (সিবিআই) এই মামলার পুনর্তদন্তের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন বিশেষ তদন্ত দল (সিট) গঠনের আদেশ দেন। একই সঙ্গে আগামী ২৫ জুনের মধ্যে উচ্চ আদালতে তদন্তের নতুন প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
এর আগে, বিগত ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ সিবিআই আদালতের কাছে একটি তদন্ত রিপোর্ট পেশ করেছিল। তবে বিজ্ঞ আদালত সেই প্রতিবেদনকে ঘটনার রহস্য উন্মোচনে পর্যাপ্ত ও সন্তোষজনক মনে করেননি। উচ্চ আদালতের নতুন এই কড়া নির্দেশনার পরপরই সিবিআইয়ের পক্ষ থেকে দ্রুত তিন সদস্যের একটি শক্তিশালী বিশেষ তদন্ত দল (সিট) গঠন করা হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিল বাংলা: একমাত্র আসামির সাজা
বিগত ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট রাতের আঁধারে কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ভেতরে এক তরুণী অন-ডিউটি চিকিৎসক নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এই পৈশাচিক ঘটনার প্রতিবাদে তৎকালীন সময়ে পুরো পশ্চিমবঙ্গজুড়ে প্রতিবাদের দাবানল জ্বলে ওঠে। রাজ্যের চিকিৎসক, শিক্ষার্থীসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ অপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে রাস্তায় নেমে আসেন। সেই সময় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র গণ-অসন্তোষ ও নজিরবিহীন সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে।
নৃশংস এই ঘটনার পর পুলিশ সঞ্জয় রায় নামের এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে গ্রেপ্তার করে এবং পরবর্তীতে তাকেই একমাত্র মূল অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। যদিও সঞ্জয় রায় আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন, “তিনি এই খুনের সঙ্গে জড়িত নন। তাকে ফাঁসানো হয়েছে।” তবে সব সাক্ষ্য-প্রমাণ শেষে ২০base সালের ২০ জানুয়ারি আদালতের চূড়ান্ত রায়ে সঞ্জয়কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং বর্তমানে সে কারাগারেই বন্দি রয়েছে।
‘অভয়া’র পরিবারের অসন্তোষ ও শুভেন্দু অধিকারীর সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা
সঞ্জয় রায়ের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলেও আদালতের এই আংশিক বিচারে কোনোভাবেই সন্তুষ্ট হতে পারেনি নিহত চিকিৎসকের পরিবার, ঘটনার পর থেকে যাকে পুরো ভারত ‘অভয়া’ নামে ডেকে আসছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির শীর্ষ নেতারা নির্বাচনের আগে থেকেই জোরালো দাবি করে আসছিলেন যে, তারা রাজ্যে ক্ষমতায় এলে এই লোমহর্ষক মামলার আড়ালে থাকা সত্য উন্মোচনে আবার নতুন করে তদন্তের ব্যবস্থা করবেন।
বিজেপির প্রভাবশালী নেতা শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচনী প্রচারণায় স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, ভোটে তারা জয়ী হলে আরজি কর ধর্ষণ-হত্যা মামলার বিচার আবার করা হবে। শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের এই নির্দেশনার মাধ্যমে তাঁর সেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণ হলো। রায় হয়ে যাওয়া একটি মামলার পুনরায় তদন্তের এই আদেশ আইন ও রাজনীতির ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
ক্ষমতার মসনদে বসার পরপরই শুভেন্দু অধিকারী পূর্ববর্তী তদন্ত প্রক্রিয়ায় গাফিলতির অভিযোগে জড়িত থাকা রাজ্যের তিন প্রভাবশালী আইপিএস কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। বরখাস্ত হওয়া এই পুলিশ কর্মকর্তাদের তালিকায় ছিলেন কলকাতার সাবেক বহুল বিতর্কিত পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েল।
কাঠগড়ায় সাবেক বিধায়ক ও মমতা: উত্তপ্ত হচ্ছে রাজনীতির ময়দান
এই আইনি লড়াইয়ের মাঝেই নিহত চিকিৎসকের মা রত্না দেবনাথ পানিহাটির সাবেক তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষসহ মোট তিনজনের বিরুদ্ধে নতুন করে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছেন। মেয়ের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আর যারা যারা মাস্টারমাইন্ড হিসেবে জড়িত ছিল, তাদের প্রত্যেককে টেনে বের করে কঠিন শাস্তি না দেওয়া পর্যন্ত তাঁর এই লড়াই থামবে না বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, নির্বাচনী প্রচারের ময়দানে শুভেন্দু অধিকারী সাধারণ জনগণকে কথা দিয়েছিলেন যে, অভয়া হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দেওয়ার পেছনে সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কী ভূমিকা ছিল, তা নিয়েও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে। ফলে কলকাতা হাইকোর্টের এই যুগান্তকারী পুনর্তদন্তের আদেশের জেরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন করে আরও উত্তপ্ত ও সংঘাতময় হয়ে ওঠার রসদ তৈরি হচ্ছে।