
শুধু ডিগ্রি অর্জন নয়, উচ্চশিক্ষা শেষ করে শিক্ষার্থীরা যেন চাকরি কিংবা উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেন—এ লক্ষ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয় ও পাঠ্যক্রম নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক চাহিদা এবং শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই উচ্চশিক্ষার বিষয় ও পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলাও উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
শুক্রবার সাভারের ব্র্যাক সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজমেন্টে (ব্র্যাক সিডিএম) ‘উপাচার্যদের সংলাপ: উচ্চশিক্ষার ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী জাতীয় সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) হায়ার এডুকেশন এক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় এ সংলাপের আয়োজন করা হয়।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত প্রশ্নোত্তর পর্বে উচ্চশিক্ষার নানা চ্যালেঞ্জ, গবেষণা ও উদ্ভাবন, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প খাতের সহযোগিতা এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে উপাচার্যদের প্রশ্নের উত্তর দেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী।
আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল পর্যায়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, আগামী বছরগুলোতে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। তবে শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই হবে না; এর কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা, গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে যে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তার কাঙ্ক্ষিত সুফল নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বর্তমান বাজারনির্ভর অর্থনীতিতে শিক্ষারও একটি অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা সক্ষমতা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রম সম্পর্কে শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবহিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব ছাড়া দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবন ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, দেশের শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব সমস্যার সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা করতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় অর্থায়ন এবং গবেষণার ফলাফল বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগাতে বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। গবেষণা যেন কেবল প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং জাতীয় উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে বাস্তব অবদান রাখে—তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহ্দী আমিন বলেন, উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্ভাবন, গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইনোভেশন হাব, ইনকিউবেশন সেন্টার এবং সমন্বিত স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি পূর্ণাঙ্গ ইনোভেশন ইকোসিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ধারণা শুধু প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সরকারি অনুদান ও অর্থায়নের মাধ্যমে সেগুলোকে সফল স্টার্টআপে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় শিল্পাঞ্চল, হাইটেক পার্ক কিংবা অর্থনৈতিক অঞ্চল থাকলেও স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর যোগাযোগ এখনও গড়ে ওঠেনি। এই বিচ্ছিন্নতা দূর করে শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে সমন্বিত সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের লাইসেন্সিংসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতেও সরকার নীতিগত সহায়তা দেবে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত করতেও সরকার সক্রিয় ভূমিকা রাখবে।
পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মাহ্দী আমিন বলেন, সংলাপে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এবং এর মানোন্নয়নে করণীয় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে, সেগুলোও তাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, গত কয়েক বছরে দেশে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে শিক্ষার মান নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং তাদের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে গড়ে তোলা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।
মতবিনিময় পর্বে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজসহ অন্যরা অংশ নেন।
দুই দিনব্যাপী এই জাতীয় সংলাপে দেশের ৬৫টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, নীতিনির্ধারক, দেশি-বিদেশি শিক্ষাবিদ এবং উচ্চশিক্ষা বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।