
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক আগ্রাসন ও নৌ-অবরোধের জবাবে পাল্টা আঘাত হেনেছে তেহরান। বুধবার (১৫ জুলাই) উপসাগরীয় তিনটি দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। একই সঙ্গে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত 'হরমুজ প্রণালি' সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ রাখার ঘোষণা দিয়ে ওয়াশিংটনকে চরম বার্তা দিয়েছে ইরান।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরে আসার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই পরিস্থিতি এমন অগ্নিগর্ভ রূপ নিল। এই চরম সংঘাতের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় ১০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
'তেল-গ্যাস রপ্তানি হয় সবার জন্য, নয়তো কারও জন্য নয়'
ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, নতুন করে মার্কিন অবরোধের মুখে পড়ে তাদের তেল ও গ্যাস রপ্তানি ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। এর জবাব হিসেবে ওয়াশিংটনের মিত্র দেশগুলোর জ্বালানি সরবরাহের পথও আটকে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা। এক বিবৃতিতে আইআরজিসি স্পষ্ট করে বলেছে:
“এই অঞ্চলের তেল-গ্যাস রপ্তানি হয় সবার জন্য খোলা থাকবে, নয়তো কারো জন্যই থাকবে না।”
এদিকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি অভিযোগ করে বলেছেন, মার্কিন এই অবরোধ গত মাসে ইসলামাবাদে স্বাক্ষরিত শান্তি চুক্তি ‘ইসলামাবাদ স্মারক’-কে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে।
রণক্ষেত্র হরমুজ প্রণালি: হামলা ও পাল্টা হামলা
চলমান সংঘাতের পঞ্চম দিনে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে তারা ইরানের উপকূলীয় অঞ্চল ও প্রণালির কাছাকাছি থাকা ডজনেরও বেশি সামরিক ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালিয়েছে। ইরানি গণমাধ্যমের সূত্রমতে, দেশটির বন্দর নগরী বন্দর আব্বাস, কিশ দ্বীপ এবং বন্দর ইমাম খোমেনিতে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার পরপরই বাহরাইনজুড়ে সতর্ক সাইরেন বেজে ওঠে। কুয়েত ও জর্ডান দাবি করেছে, তারা নিজেদের আকাশসীমায় ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা দাবি করেছে, জর্ডানে থাকা মার্কিন বিমান ঘাঁটি এবং বাহরাইন ও কুয়েতের মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে আইআরজিসি সফলভাবে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সম্পন্ন করেছে।
দুই পক্ষের হুঁশিয়ারি ও ক্ষয়ক্ষতি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তেহরানকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন:
“তেহরান যদি আলোচনায় না বসে তাহলে আগামী সপ্তাহে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতে আরও বড় আকারের হামলা চালানো হবে।”
সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেছেন, গত সপ্তাহে ইরান পরিকল্পিতভাবে সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে। যার ফলে অন্তত ১২ জন বেসামরিক নাবিক নিহত, নিখোঁজ অথবা আহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার ওমান উপকূলে একটি নরওয়েজিয়ান ট্যাংকারে বিস্ফোরণ এবং কুয়েতের একটি নৌযান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও এর অন্তর্ভুক্ত। অপরদিকে, মার্কিন বিমান হামলায় ইরানে অন্তত ২৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। দিমোনা শহর থেকে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন:
“আমাদের ওপর হামলা করে কেউ পার পেয়ে যাবে সেই দিন শেষ হয়ে গেছে।”
(তথ্যসূত্র: আল আরাবিয়া)