
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ আইনের প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতার ধারায় সংশোধনের প্রস্তাব করা হবে।
আইন সংশোধন হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী চাকরিতে বহাল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। নির্বাচনে অংশ নিতে হলে আগে চাকরি ছাড়তে হবে।
তবে নির্বাচন কমিশনের এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোট’। সংগঠনটির দাবি, সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা না দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকার সীমিত করা হলে শিক্ষক সমাজে অসন্তোষ সৃষ্টি হবে।
বর্তমানে দেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা সাড়ে ৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় প্রায় ৫ লাখ ৪৩ হাজার, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় ২২ হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন।
আগামী অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আইন ও বিধিমালা সংস্কারের কাজ করছে নির্বাচন কমিশন। এরই ধারাবাহিকতায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিধানেও পরিবর্তনের চিন্তাভাবনা চলছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, বর্তমানে আপিল বিভাগের একটি রায়ের কারণে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। তবে কমিশন মনে করছে, তারা যাতে চাকরিতে থেকে নির্বাচন করতে না পারেন, সে বিধান স্থানীয় সরকার আইনে যুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, “বেসরকারি শিক্ষকরা বর্তমানে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। কিন্তু তারা যেহেতু পূর্ণকালীন চাকরিতে নিয়োজিত, তাই পদে থেকে চেয়ারম্যান বা মেয়র হওয়া সমীচীন নয়।”
অন্যদিকে, এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব দেলাওয়ার হোসেন আজীজী বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকার যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করে তাদের সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা দেয়, তাহলে সরকারি কর্মচারীদের মতো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার বিধান মেনে নেওয়া হবে। কিন্তু সেই মর্যাদা না দিয়ে শুধু নির্বাচনের অধিকার সীমিত করা হলে শিক্ষক সমাজে অসন্তোষ তৈরি হবে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ আইনের প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতার ধারায় ‘কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পদে সার্বক্ষণিক অধিষ্ঠিত থাকেন’—এ ধরনের বাক্য সংযোজনের প্রস্তাব করা হবে।
আরও যেসব পরিবর্তনের চিন্তা করছে ইসি
নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত আইনে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে—
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় ‘সশস্ত্র বাহিনী’ অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনী মোতায়েনের আইনি ভিত্তি স্পষ্ট থাকে।
ফেরারি আসামি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রভুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা।
ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার ও পরিচালকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ সীমিত করা।
বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল গঠন।
ঋণগ্রহীতার সংজ্ঞায় গ্যারান্টারকেও অন্তর্ভুক্ত করা।
এ ছাড়া নির্বাচন পরিচালনা বিধি ও আচরণবিধিতেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া এবং জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানান, এ সপ্তাহেই কমিশনের বৈঠকে সংশোধনী প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। কমিশনের অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে সরকার চাইলে সেগুলো সংসদে উত্থাপন করবে। সংসদে পাস হলে সংশোধিত আইন কার্যকর হবে।