.webp)
দেশের একমাত্র বিশেষায়িত ও প্রথম পূর্ণাঙ্গ নারী কারাগার কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার। সাধারণ বন্দিদের পাশাপাশি এই কারাগারে মায়েরা তাদের ছোট সন্তানদেরও সঙ্গে রাখতে পারেন। ফলে কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যেই অনেক শিশুর শৈশব কেটে যাচ্ছে।
বর্তমানে কাশিমপুর মহিলা কারাগারে মায়েদের সঙ্গে রয়েছে ৬২ শিশু। তাদের মধ্যে ২৭ জন ছেলে এবং ৩৫ জন মেয়ে। শিশুদের পরিচর্যা ও পড়াশোনার জন্য কারাগারের ভেতরে রয়েছে আলাদা পরিচর্যা কেন্দ্র ও শ্রেণিকক্ষ।
সাত বছর পর মায়ের সঙ্গে কারামুক্ত এক শিশু
কারাসূত্রে জানা যায়, কিছুদিন আগেও কারাগারে শিশুর সংখ্যা ছিল ৬৩। তবে গত মঙ্গলবার ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় মায়ের সঙ্গে সাত বছর কারাবন্দি থাকার পর মোবাশ্বেরা খানম রাথী মুক্তি পাওয়ায় বর্তমানে শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২ জনে।
মোবাশ্বেরা খানম রাথীর কারাগারে আসার গল্পটিও অন্যদের থেকে আলাদা। ২০১৯ সালে নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার সময় তার মা কামরুন্নাহার মনি ছিলেন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
কারাগারের ভেতরেই কন্যাসন্তান জন্ম দেন কামরুন্নাহার। শিশুটির নাম রাখা হয় মোবাশ্বেরা খানম রাথী। অর্থাৎ মায়ের গর্ভে থাকতেই তার কারাবন্দি জীবনের শুরু। দীর্ঘ সাত বছর পর মা ও মেয়ের সেই কারাজীবনের অবসান হয়েছে।
কারাগারের ভেতরেই মেয়ের পড়াশোনা ও শৈশব
মুক্তি পাওয়ার পর কামরুন্নাহার মনি বলেন, তিনি কারাগারের ভেতর থেকেই মেয়েকে ক্লাস টুয়ের বই পড়িয়েছেন। পাশাপাশি তাকে কুরআন পড়া শেখানো হয়েছে। মেয়েকে কুরআনের শেষের এক পাড়া মুখস্থও করিয়েছেন তিনি।
মা হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালনে কারাগারের ভেতর থেকেই সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন বলে জানান কামরুন্নাহার। মেয়ের জন্য খেলনা কেনার সামর্থ্য না থাকায় পায়ের মোজা দিয়ে পুতুল বানিয়ে দিয়েছিলেন। সেই পুতুল দিয়েই মেয়ে খেলত।
এমনকি মেয়ের জামা কেটে স্কুলব্যাগও তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনি। সেই ব্যাগ কাঁধে নিয়েই স্কুলে যেত তার মেয়ে।
ধারণক্ষমতা ২১২, বন্দি সাড়ে ৭ শতাধিক
কাশিমপুর মহিলা কারাসূত্রে জানা যায়, কারাগারটির বন্দি ধারণক্ষমতা ২১২ জন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে সাড়ে ৭শ জনের বেশি বন্দি রয়েছেন।
কারাগারে থাকা নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন হত্যা মামলার আসামিরা। এর বাইরে মাদক মামলা ও সাধারণ মামলায় আটক বন্দিরাও রয়েছেন। কারাগারটিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিও আছেন।
সাধারণ বন্দিদের রাখা হয় কলমিলতা ভবনে। আর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে মাধবীলতা ভবনে।
এই বন্দিদের মধ্যেই অর্ধশতাধিক মায়ের সঙ্গে কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে শৈশব পার করছে ৬২ শিশু। তবে কারাগারে ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দির সংখ্যা বেশি হওয়ায় শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
শিশুদের জন্য রয়েছে ডে-কেয়ার ও শ্রেণিকক্ষ
কারাগারে থাকা শিশুদের পরিচর্যা এবং তাদের সুস্থ বিকাশের জন্য রয়েছে একতলা একটি ডে-কেয়ার সেন্টার। শিশুদের জন্য এই কেন্দ্রে ছোট একটি খেলার মাঠ, শ্রেণিকক্ষ, লাইব্রেরি এবং বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার সরঞ্জাম রাখা হয়েছে।
ডে-কেয়ার সেন্টারে শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি বিনোদনের ব্যবস্থাও রয়েছে। কেন্দ্রটির জন্য শিক্ষকও রয়েছেন। তিন বছরের বেশি বয়সী শিশুদের সেখানে অক্ষরজ্ঞান ও প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়।
শুধু পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ নয় শিশুদের কার্যক্রম। তাদের নৃত্য, গান ও চিত্রাঙ্কনও শেখানো হয়।
যত্নে শিশুদের বেড়ে ওঠার চেষ্টা
কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেলার মোছা. আলিভা শারমিন বলেন, কারাগারে বর্তমানে ৬২ শিশু রয়েছে। তাদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা আছে। সেখানে শিক্ষক ও আয়া রয়েছেন এবং শিশুদের অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে লালন-পালন করা হয়।
কাশিমপুর কারাগারের অতিরিক্ত জেল সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, মায়ের সঙ্গে কারাগারে থাকা শিশুদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুদের থাকা-খাওয়া, লেখাপড়া ও বিনোদনের পাশাপাশি ডে-কেয়ার এবং স্কুলের ব্যবস্থাও রয়েছে। তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে যেন কোনো ধরনের বাধা তৈরি না হয়, সে বিষয়েও কারা কর্তৃপক্ষ নজর রাখে।