
হাভানা ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার কয়েক দশকের পুরোনো শীতল যুদ্ধ এবার রূপ নিয়েছে চরম কূটনৈতিক ও আইনি সংঘাতে। কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনার ঠিক পরদিনই দেশটিকে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন মার্কিন প্রশাসনের অন্যতম নীতি-নির্ধারক মার্কো রুবিও। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দুই দেশের বিদ্যমান বৈরী পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উপায়ে চলমান সংকট সমাধানের সম্ভাবনা বর্তমানে একেবারেই ক্ষীণ।
যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে ১৯৯৬ সালের একটি আলোচিত বিমান ভূপাতিত করার ঘটনায় মার্কিন নাগরিকদের হত্যার দায়ে রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের পরদিনই রুবিওর এই বিস্ফোরক মন্তব্য সামনে এলো। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন এখনো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোলা রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে তিনি একই সঙ্গে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন যে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষার্থে যেকোনো ধরনের হুমকির বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
কূটনৈতিক অচলাবস্থা নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে গিয়ে রুবিও সরাসরি বলেন, ‘কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোটাই এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পছন্দ। আমি সত্যি কথাই বলছি। তবে বর্তমানে যাদের সঙ্গে আমরা কাজ করছি, তাতে এমন সমাধানের সম্ভাবনা খুব একটা নেই।’
এখানেই থামেননি রুবিও; তিনি কিউবাকে সমগ্র লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও অভিযুক্ত করেন।
অভিযোগ অস্বীকার কিউবার, সুর চড়ালো বেইজিং ও মস্কো
মার্কিন প্রশাসনের এমন গুরুতর অভিযোগের পর পাল্টা জবাব দিতে দেরি করেননি কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগুয়েজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক পোস্টে তিনি ওয়াশিংটনের এই দাবিকে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।
নিজের একাউন্টে দেওয়া ওই পোস্টে তিনি লেখেন, কিউবা কখনোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য ক্ষতিকর বা হুমকি ছিল না। বরং হোয়াইট হাউস অত্যন্ত ‘নির্দয় ও পরিকল্পিতভাবে’ দীর্ঘদিন ধরে কিউবার অর্থনীতি ও জনগণের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছে। কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দাবি, মার্কো রুবিও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।
এর আগে, গত বুধবার মায়ামিতে এক সংবাদ সম্মেলন করে কিউবার সাবেক কমিউনিস্ট শাসক রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগপত্র ঘোষণা করেন মার্কিন ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্লাঞ্চ। এ সময় তিনি মন্তব্য করেন, ওয়াশিংটন আশা করছে কাস্ত্রো ‘নিজ ইচ্ছায় বা অন্য কোনোভাবে’ মার্কিন আদালতে হাজির হবেন।
সাংবাদিকেরা যখন মার্কো রুবিওর কাছে জানতে চান, ৯৪ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রোকে আদৌ কোনোদিন আমেরিকার মাটিতে এনে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব কি না, বা করা হলে তা কীভাবে করা হবে; জবাবে রুবিও বেশ চতুরতার সাথে বলেন, ‘আমরা যদি তাকে এখানে আনার চেষ্টা করি, তবে সেই পরিকল্পনা আমি গণমাধ্যমকে কেন বলব?’
ফ্লোরিডা থেকে কিউবান কর্মকর্তার বোন গ্রেপ্তার
এই আইনি লড়াইয়ের মাঝেই মার্কিন কর্তৃপক্ষ আদিস লাস্ত্রেস মোরেরা নামের এক কিউবান নারীকে গ্রেপ্তার করার তথ্য দিয়েছে। মোরেরা মূলত কিউবার সামরিক বাহিনী দ্বারা পরিচালিত একটি বিশাল বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর শীর্ষ কর্মকর্তার আপন বোন। উল্লেখ্য, এই সামরিক নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীটিই কিউবার অর্থনীতির সবচেয়ে লাভজনক ও গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
রুবিও অভিযোগ তোলেন, মোরেরা ফ্লোরিডায় বিলাসী জীবনযাপন করলেও পর্দার আড়াল থেকে হাভানার কমিউনিস্ট সরকারকে প্রত্যক্ষভাবে বিভিন্ন সহায়তা জোগাচ্ছিলেন। মার্কিন অভিবাসন কর্তৃপক্ষ (ICE) তাকে ইতিমধ্যে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে এবং আইনি বহিষ্কার প্রক্রিয়া (Deportation) শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি বন্দি থাকবেন।
কিউবাকে ‘ব্যর্থ দেশ’ বললেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
এদিকে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবাকে একটি ‘ব্যর্থ দেশ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তবে তিনি দাবি করেন, তাঁর প্রশাসন সম্পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কিউবার সাধারণ জনগণকে সাহায্য করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
কয়েক দশকের এই ভূ-রাজনৈতিক জট খোলা প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘৫০-৬০ বছর ধরে অন্য প্রেসিডেন্টরা এ বিষয়ে কী করা যায়, তা ভেবেছেন। মনে হচ্ছে, আমিই হয়তো সেটা বাস্তবায়ন করতে পারব। আর আমি সেটা করতে পারলে খুশি হব।’
অন্যদিকে, আমেরিকার মাটিতে রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ দায়েরের এই মার্কিন পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে কিউবার দুই প্রধান মিত্র চীন ও রাশিয়া। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে কিউবার ওপর থেকে সব ধরনের ‘জবরদস্তি’ ও ‘হুমকি’ প্রদর্শনের রাজনীতি অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। অপরদিকে ক্রেমলিন (রাশিয়া) এক কড়া বার্তায় বলেছে, হাভানার ওপর ওয়াশিংটন বর্তমানে যে চরম ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে, তা ‘সহিংসতার কাছাকাছি’ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
বর্তমানে কিউবা ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জ্বালানি বিপর্যয় ও খাদ্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং বাইরে থেকে দ্বীপে তেল সরবরাহের পথগুলো অবরুদ্ধ করার কারণে দেশটিতে দিনের পর দিন দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাট (ব্ল্যাকআউট) দেখা দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে শুরু হওয়া এই তীব্র কূটনৈতিক উত্তেজনা ও আইনি যুদ্ধ ওয়াশিংটন-হাভানা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও বেশি জটিল ও সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।