
গণভোটে পাওয়া জনগণের সরাসরি রায়কে পাশ কাটিয়ে সরকার দেশকে গভীর রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে—এমন অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
শনিবার (২ মে) দুপুরে খুলনা প্রেসক্লাবে খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘গণভোটের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার: সংকটের মুখোমুখি দেশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
গোলাম পরওয়ার দাবি করেন, জুলাই সনদের আড়ালে গণভোটের ফলাফলকে অস্বীকার করা হচ্ছে। তার মতে, এটি কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং সরাসরি জনগণের ম্যান্ডেটের বিরোধিতা।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়—এই দুই বিষয়কে আলাদা করে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। সংসদে দাঁড়িয়ে মন্ত্রীরা বারবার জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও গণভোটের সরাসরি রায় নিয়ে নীরব রয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, “একবারও কোনো মন্ত্রী বলেননি, গণভোটের রায় অক্ষরে অক্ষরে মানা হবে। কারণ তারা জানে, সেটি মানলে তাদের রাজনৈতিক হিসাব ভেঙে পড়বে।”
গণভোটের আগে দীর্ঘ সময় থাকা সত্ত্বেও কেন আপত্তি তোলা হয়নি—এ প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদে স্বাক্ষর, ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশ, ২৫ নভেম্বর গণভোটের অধ্যাদেশ এবং ফেব্রুয়ারিতে ভোট—এই পুরো সময়জুড়ে কেউ এসবকে অসাংবিধানিক বলেননি। অথচ ক্ষমতায় এসে এখন সেগুলো অবৈধ বলা হচ্ছে, যা তার ভাষায় সুস্পষ্ট দ্বিচারিতা।
সংবিধান সংস্কারের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৭টি আইনি ও সাংবিধানিক সংশোধনের বিষয় উল্লেখ করে গোলাম পরওয়ার বলেন, এসব বিষয়ে ঐকমত্য থাকলেও ১০টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, যা সংস্কারের মূল কাঠামোকেই দুর্বল করে দেয়।
তিনি বলেন, যেসব বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে—প্রধানমন্ত্রী একইসঙ্গে দলপ্রধান থাকতে পারবেন না, উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতি গ্রহণে আপত্তি, আন্তর্জাতিক চুক্তি সংসদে উপস্থাপন ও অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা না মানা, বিচারপতি নিয়োগে স্বাধীন কমিশনের বিরোধিতা এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রভাব কমানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান।
গোলাম পরওয়ার বলেন, এই ১০টি বিষয় বাদ দিলে পুরো সংস্কারই অর্থহীন হয়ে পড়ে এবং এখানেই সরকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণে পাওয়া গণভোটের রায় সংসদের ডেলিগেটেড ক্ষমতার চেয়েও বেশি শক্তিশালী।
তিনি বলেন, “সংসদ সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি, তারা ডেলিগেটেড পাওয়ার এক্সারসাইজ করেন। কিন্তু গণভোটে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত দেয়। সেই সিদ্ধান্ত অস্বীকার করা মানে জনগণের সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করা।”
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “পার্লামেন্টে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলনের পথেই যেতে বাধ্য হবে সংশ্লিষ্টরা। পাঁচ কোটি মানুষ যে রায় দিয়েছে, তা যদি সংসদে বাস্তবায়ন না হয়, আমরা আবার জনগণের কাছে ফিরে যাব। আন্দোলনই তখন একমাত্র পথ।”
সরকারকে সতর্ক করে তিনি আরও বলেন, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং সংকট এড়াতে হলে জনগণের ম্যান্ডেটকে সম্মান জানাতে হবে। অন্যথায় এর দায় সরকারের ওপরই বর্তাবে।