
গরমের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে ঘাম, অতিরিক্ত তেল নিঃসরণ, ধুলাবালি ও সূর্যের প্রভাবে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। এতে লোমকূপ বন্ধ হয়ে ব্রণ, ফুসকুড়ি, র্যাশ ও ট্যানিং বেড়ে যায়। এ অবস্থায় নিয়মিত ও সঠিক যত্ন না নিলে ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয় বলে জানিয়েছেন অভিজ্ঞ বিউটিসিয়ান ও স্কিন স্পেশালিস্ট আতিয়া জামান পলি। তিনি জানান, কিছু সহজ অভ্যাস মেনে চললেই গরমেও ত্বক ভালো রাখা সম্ভব।
তিনি গরমে ত্বক সুস্থ রাখার জন্য বিস্তারিত কিছু পরামর্শ দিয়েছেন—
১. গরমে ঘাম ও তেল বেশি নিঃসৃত হয়, যা ধুলাবালির সঙ্গে মিশে লোমকূপ বন্ধ করে দেয়। এতে ব্রণ ও ফুসকুড়ি দেখা দেয়। তাই দিনে ২ থেকে ৩ বার ঠান্ডা বা স্বাভাবিক পানি দিয়ে মুখ ধোয়া ভালো। এতে ত্বকের ওপর জমে থাকা তেল ও ময়লা কিছুটা দূর হয় এবং ত্বক সতেজ থাকে। তবে অতিরিক্ত ধোয়া ত্বকের প্রাকৃতিক আর্দ্রতা নষ্ট করতে পারে, তাই ভারসাম্য রাখা জরুরি।
২. গরমে সিবাম বা তেল নিঃসরণ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়, ফলে ত্বক বেশি অয়েলি হয়ে পড়ে। এ সময় মৃদু ও হালকা ক্লিনজার ব্যবহার করলে ত্বক পরিষ্কার থাকে। ত্বককে খুব বেশি ঘষে পরিষ্কার করা বা হার্শ সাবান ব্যবহার করা উচিত নয়, কারণ এতে ত্বকের প্রতিরক্ষা স্তর দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
৩. ত্বক ঠান্ডা ও শান্ত রাখতে প্রাকৃতিক কুলিং উপাদান ব্যবহার করা যায়। যেমন তরমুজের রস, শসার রস বা বরফ ঠান্ডা প্রাকৃতিক ফেস প্যাক ত্বকে সাময়িক শীতলতা আনে এবং রোমকূপ কিছুটা সংকুচিত রাখতে সাহায্য করে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও দেখা গেছে, অ্যালোভেরা, শসা ও পানিসমৃদ্ধ উপাদান ত্বকের জ্বালাপোড়া ও প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে। তবে এগুলো নিয়মিত চিকিৎসার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক পরিচর্যা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
৪. রোদে বের হওয়ার আগে অবশ্যই সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ত্বকে ট্যান, দাগ ও অকাল বার্ধক্য সৃষ্টি করে। তাই এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহার করা নিরাপদ। তৈলাক্ত ত্বকের জন্য জেল বা ওয়াটার বেজড সানস্ক্রিন বেশি উপযোগী, কারণ এগুলো ত্বকে ভারী অনুভূতি তৈরি করে না এবং পোর বন্ধ করে না।
৫. ত্বক পরিষ্কারের জন্য মৃদু, হার্শ কেমিকেল মুক্ত ফেসওয়াশ বা ক্লিনজার ব্যবহার করা উচিত। বিশেষ করে সালফেট ও অতিরিক্ত সুগন্ধিযুক্ত পণ্য ত্বককে শুষ্ক ও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে। গরমে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধরে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
৬. অতিরিক্ত গরমে যাদের ত্বক পাতলা বা সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে লালচে ভাব, জ্বালাপোড়া বা চুলকানি দেখা দিতে পারে। এ ধরনের ত্বকে ঠান্ডা পানি, অ্যালোভেরা বা হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে আরাম পাওয়া যায়। দীর্ঘ সময় রোদে থাকা এড়িয়ে চলা উচিত।
৭. অনেকে ত্বক টানটান রাখতে কাঁচা ডিমের সাদা অংশ ব্যবহার করেন। এতে সাময়িকভাবে টানটান অনুভূতি পাওয়া গেলেও এটি সব ত্বকের জন্য নিরাপদ নয়। বিশেষ করে সংবেদনশীল ত্বকে অ্যালার্জি বা ইনফেকশনের ঝুঁকি থাকতে পারে, তাই ব্যবহারে সতর্ক থাকা দরকার।
৮. গরমেও নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে হবে। অনেকেই মনে করেন গরমে ময়েশ্চারাইজার দরকার নেই, কিন্তু এটি ভুল ধারণা। হালকা, ওয়াটার বেজড বা জেল ময়েশ্চারাইজার ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং অতিরিক্ত তেল নিঃসরণও নিয়ন্ত্রণে রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিক ময়েশ্চারাইজার ত্বকের পানিশূন্যতা ও অতিরিক্ত অয়েলি ভাব কমাতে সহায়তা করে।
৯. অতিরিক্ত পাউডার ব্যবহার করা ঠিক নয়। অনেক পাউডারে থাকা উপাদান ত্বকের প্রাকৃতিক আর্দ্রতা শুষে নেয়, ফলে ত্বক রুক্ষ ও নিস্তেজ হয়ে যেতে পারে। গরমে হালকা ব্যবহারই ভালো।
১০. পর্যাপ্ত পানি পান করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীর ডিহাইড্রেটেড হলে ত্বকেও এর প্রভাব পড়ে, ত্বক শুষ্ক ও ক্লান্ত দেখায়। দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীর ভেতর থেকে হাইড্রেট থাকে এবং ত্বকও সতেজ থাকে।
১১. খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনা জরুরি। তৈলাক্ত, ভাজাপোড়া ও জাঙ্ক ফুড বেশি খেলে শরীরে তেল উৎপাদন বেড়ে যেতে পারে, যা ত্বকে ব্রণ বাড়ায়। তাই এসব খাবার কম খাওয়াই ভালো।
১২. গরমে পানি সমৃদ্ধ ফল যেমন তরমুজ, শসা, কমলা ও ডাব খাওয়া ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। এগুলো শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখে এবং ত্বককে সতেজ রাখতে ভূমিকা রাখে।
সব মিলিয়ে গরমে ত্বক ভালো রাখতে চাইলে নিয়মিত পরিচর্যা, সঠিক পণ্য ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সচেতনতা ও ধারাবাহিক যত্নই পারে ত্বককে গরমের ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে।