
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) প্রযুক্তির বিশ্ববাজারে চীনের সঙ্গে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে আমেরিকা পিছিয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী আদেশে সই করা থেকে বিরত থাকলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। হোয়াইট হাউজের এই নাটকীয় সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালি তথা প্রযুক্তি বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি নতুন দিকনির্দেশনামূলক আইনি রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছিল। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২২ মে) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করার কথা ছিল। এই উপলক্ষ্যে মার্কিন শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের (সিইও) নিয়ে হোয়াইট হাউজে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। তবে একদম শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের আপত্তির কথা জানিয়ে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, "আমরা চীনের চেয়ে এগিয়ে আছি। অন্য সবার চেয়েও এগিয়ে। আমি এমন কিছু করতে চাই না যা এই অগ্রগতিতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।"
খসড়া আদেশের বেশ কিছু ধারা তার পছন্দ হয়নি বলেও জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
রয়টার্সের অভ্যন্তরীণ সূত্র মারফত জানা গেছে, প্রস্তাবিত নীতিমালায় এআই সংস্থাগুলোর জন্য মূলত একটি স্বেচ্ছাসেবাভিত্তিক নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো তৈরির কথা বলা হয়েছিল। এই নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের অত্যাধুনিক ও শক্তিশালী এআই মডেল জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করার আগে মার্কিন সরকারের সঙ্গে যৌথ সমন্বয় করতে বাধ্য থাকত। এছাড়া, ব্যাংক ও হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগুলোর সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের রূপরেখাও এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
তবে খসড়া দলিলের ঠিক কোন কোন ধারা বা বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আপত্তি ছিল, তা এখনো পরিষ্কার করা হয়নি।
আমেরিকার প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, এআই খাতের ওপর সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা আইনি বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে নতুন নতুন প্রযুক্তি বাজারে আনার প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়ে পড়বে। এতে যেমন বৈশ্বিক উদ্ভাবনে যুক্তরাষ্ট্র পিছিয়ে পড়বে, তেমনি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। বিশেষ করে, সম্ভাব্য ঝুঁকি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যদি কোম্পানিগুলোকে তাদের এআই মডেলের মূল কাঠামো ও আচরণে পরিবর্তন আনতে হয়, তবে তা বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে, এই নির্বাহী আদেশ স্থগিতের পেছনে মার্কিন প্রশাসনের ওপর পর্দার আড়ালের বড় চাপ কাজ করেছে। এক্সএআই-এর প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ক, মেটা প্রধান মার্ক জুকারবার্গ এবং ট্রাম্পের সাবেক এআই উপদেষ্টা ডেভিড স্যাকস এই আদেশ সই না করার জন্য প্রশাসনের ওপর লবিং করেছিলেন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
অবশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় এই লবিংয়ের দাবি পুরোপুরি উড়িয়ে দিয়েছেন ইলন মাস্ক। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "আদেশে কী ছিল, সেটিই তিনি জানতেন না। ট্রাম্প সই না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তার সঙ্গে কথা হয়েছে।"
বর্তমান সময়ে শক্তিশালী এআই মডেলগুলোর নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একাংশ সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, এসব উন্নত প্রযুক্তির অপব্যবহারে ভবিষ্যতে সাইবার হামলার মাত্রা আরও জটিল ও সুদূরপ্রসারী রূপ নিতে পারে। ফলে এই খাতে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরির দাবিও জোরালো হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ট্রাম্প প্রশাসন সিলিকন ভ্যালির টেক জায়ান্টদের প্রতি কিছুটা নরম ও উদার নীতি গ্রহণ করছে। যা সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলের ঠিক বিপরীত; কারণ বাইডেন প্রশাসনের সময় এআই ও সামগ্রিক প্রযুক্তি খাতের ওপর কড়া নজরদারি ও কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।