
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে বিসিক শিল্পনগরীগুলো থেকে বছরে ১৪.০৯ মিলিয়ন টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব বলে জানিয়েছে বেসরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে কার্বন ক্রেডিটের সুবিধা ব্যবহার করে বছরে প্রায় ০.৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব আয় করাও সম্ভব। এছাড়া চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের সাফল্যকে মডেল হিসেবে গ্রহণ করে বাংলাদেশ এসএমই খাত বিকেন্দ্রীভূত রুফটপ সোলার প্যানেল ব্যবহার করলে পরিচালনা ব্যয় ৩০–৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব, যা পরিবেশগত মান বজায় রেখে রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশের মোট শিল্প ইউনিটের ৯০ শতাংশের বেশি এসএমই খাতে অন্তর্ভুক্ত, যা শিল্প খাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমশক্তি নিয়োগ করে এবং জিডিপিতে ২৫–৩০ শতাংশ অবদান রাখে। তবে এই খাতের প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর, যা বিশ্ববাজারের অস্থিরতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ।
জাতীয়ভাবে বাংলাদেশের এনডিসি ৩.০ লক্ষ্য অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে জ্বালানি খাত থেকে ৬৯.৮৪ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারিত আছে। গবেষণায় বিসিক শিল্পনগরীর চারটি উচ্চ-প্রভাবশালী খাতের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে: চামড়া, প্লাস্টিক উৎপাদন, প্লাস্টিক প্যাকেজিং এবং হালকা প্রকৌশল। এই চার খাত সম্মিলিতভাবে বছরে আনুমানিক ৪৬.৯৯ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ করে, যার মধ্যে ১৪.০৯৭ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব।
খাতভিত্তিক সম্ভাব্য নিঃসরণ হ্রাস:
চামড়া শিল্প: ১৯–৩৩%
হালকা প্রকৌশল: ১৯–৩১%
প্লাস্টিক উৎপাদন: ৩৩–৪৯%
প্যাকেজিং: ১৫–২৮%
শিল্পনগরী পর্যায়ে রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব। বিসিক শিল্পনগরীর মাত্র ১০% খালি জায়গা ব্যবহার করলে প্রায় ৫৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা বছরে ৫১,৪৪০.৭১ টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস করবে। যদি এই জায়গা ২০% করা হয়, তাহলে বছরে ১,১২,৮৮১.৪১ টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব।
গবেষণার প্রধান উপস্থাপক এম জাকির হোসেন খান উল্লেখ করেছেন, ২০ কিলোওয়াট রুফটপ সোলার সিস্টেমের মাধ্যমে দিনে প্রায় ৭৯ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, যা ৪.২ বছরের মধ্যে বিনিয়োগ ফেরত আনতে পারে। এছাড়া ওপেক্স মডেলে প্রাথমিক বিনিয়োগ ছাড়াই সৌরবিদ্যুৎ গ্রহণ করা সম্ভব এবং বিদ্যুৎ খরচ কমানো যায়।
গবেষণায় প্রস্তাবিত ডিকার্বোনাইজেশন পথনকশা:
১. শিল্পনগরী পর্যায়ে অংশীদারিত্বমূলক নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
২. ওপেক্স ও স্বল্প সুদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থায়নের উদ্ভাবনী মডেল প্রবর্তন।
৩. বিসিক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় জোরদার করা।
গবেষণা দেখায়, এসএমই খাতের ডিকার্বোনাইজেশন কেবল জ্বালানি পরিকল্পনা নয়, এটি একটি উচ্চ-প্রভাবশালী অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার। জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা কমানো সরাসরি উৎপাদন খরচ কমাবে, মুনাফা বাড়াবে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে।