
কিশোরী বয়সে একটি অনুষ্ঠানে প্রথম দেখা। পরিচয়ের শুরুতেই নিজেদের চেহারা ও অঙ্গভঙ্গির অস্বাভাবিক মিল দুজনকেই অবাক করেছিল। এরপর টেলিফোন নম্বর ও ঠিকানা বিনিময় করে চিঠি চালাচালির মধ্য দিয়ে তৈরি হয় ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। কিন্তু প্রায় ১৫ বছর আগে আচমকাই বন্ধ হয়ে যায় যোগাযোগ। কয়েক বছর পর আবার যোগাযোগ স্থাপিত হলে সামনে আসে এমন এক সত্য, যা তাদের দুজনের জীবনই বদলে দেয়—তারা শুধু পুরোনো বন্ধু নন, আপন দুই বোন।
নেদারল্যান্ডসের মিনা গেলটিঙ্ক ও মিনাল টিসেনের গল্প অনেকটা সিনেমার চিত্রনাট্যের মতো। ১৯৮০-এর দশকে ভারতের মুম্বাইয়ে জন্ম নেওয়া এই দুই নারী মাত্র কয়েক মাস বয়সেই আলাদা হয়ে যান। মুম্বাইয়ের দুটি ভিন্ন এতিমখানা থেকে তাদের দত্তক নেয় নেদারল্যান্ডসের দুটি পরিবার।
কিশোরী বয়সে একটি অনুষ্ঠানে প্রথমবার মুখোমুখি হন মিনা ও মিনাল। প্রথম দেখাতেই দুজনের চেহারা ও অঙ্গভঙ্গির মধ্যে বেশ কিছু অদ্ভুত মিল তাদের নজরে আসে।
এরপর তারা পরস্পরের টেলিফোন নম্বর ও ঠিকানা নেন। নিয়মিত চিঠি লেখার মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেই পরিচয় পরিণত হয় গভীর বন্ধুত্বে।
৪৩ বছর বয়সী মিনা সেই সময়ের স্মৃতি মনে করে বলেন, ‘বন্ধুরা আমাদের দেখে বলেছিল, 'তোমরা আয়নায় নিজেদের দেখো।' এবং আয়নায় দেখার পর আমার মনে হলো, হে ঈশ্বর, ওর কাছে তো দেখি আমার নাকটা! আমাদের হাসিও এক।’
সময়ের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন দুজন
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিনা ও মিনালের নিজেদের জীবনও ব্যস্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাদের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
প্রায় ১৫ বছর আগে মিনাল নেদারল্যান্ডস ছেড়ে ফ্রান্সে চলে যান। ফলে দীর্ঘ সময় দুই বন্ধুর মধ্যে কোনো যোগাযোগ ছিল না।
বংশপরিচয় খুঁজতে ডিএনএ পরীক্ষা
২০১৭ সালে ভারত থেকে শিশু বয়সে দত্তক নেওয়া ব্যক্তিদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে জানতে পারেন মিনা। নিজের জন্মপরিচয় ও বংশপরিচয় সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকে তিনি ডিএনএ পরীক্ষা করান।
তবে পরীক্ষায় তার ডিএনএর সঙ্গে অন্য কারও কোনো মিল পাওয়া যায়নি। পরে একপর্যায়ে ফোনের জায়গা খালি করার প্রয়োজন হওয়ায় ডিএনএ শনাক্তের অ্যাপটিও মুছে ফেলেন তিনি।
এরপর চলতি বছরের ২০ মে ফেসবুকে মিনালের কাছ থেকে একটি বার্তা পান মিনা। সেখানে লেখা ছিল, ‘আমাকে মনে আছে?’
মিনালের এই বার্তাই মিনা মুছে ফেলা ডিএনএ শনাক্তের অ্যাপটি আবার ফোনে ইনস্টল করার সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করে।
অ্যাপ খুলতেই মিলল ১০০ শতাংশ ডিএনএ
অ্যাপটি পুনরায় ইনস্টল করার পর সেটি খোলার সময় প্রচণ্ড নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন মিনা। এতটাই উদ্বিগ্ন ছিলেন যে পরপর ১০ বার ভুল পাসওয়ার্ড দিয়ে বসেন।
অবশেষে অ্যাপটি খুলতে সক্ষম হয়ে সেখানে যে ফলাফল দেখতে পান, তা দেখে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তিনি। ডিএনএ পরীক্ষায় একজন ব্যক্তির সঙ্গে তার ১০০ শতাংশ মিল পাওয়া গেছে।
সেই ব্যক্তি ছিলেন তার বহু বছরের পুরোনো বন্ধু মিনাল।
ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলই শেষ পর্যন্ত মিনা ও মিনালকে জানিয়ে দেয় তাদের সম্পর্কের অবিশ্বাস্য সত্য। তারা আসলে দুই বোন।
৪৪ বছর বয়সী মিনাল ও ৪৩ বছর বয়সী মিনা একই জৈবিক বাবা-মায়ের সন্তান। অথচ জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই তারা আলাদা হয়ে যান এবং নেদারল্যান্ডসের দুটি পরিবারে আলাদাভাবে দত্তক হয়ে বেড়ে ওঠেন।
শৈশবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও পরবর্তী জীবনে তারা আবার একে অপরের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু তখনও কেউ জানতেন না, সেই বন্ধুত্বের পেছনে রয়েছে একই বাবা-মায়ের রক্তের সম্পর্ক।
ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে সত্য জানার পর গত আগস্টে প্রথমবারের মতো বন্ধু হিসেবে নয়, দুই বোন হিসেবে পরস্পরের সঙ্গে দেখা করেন মিনা ও মিনাল।
জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে যে সম্পর্ককে তারা বন্ধুত্ব বলে জেনে এসেছিলেন, শেষ পর্যন্ত ডিএনএ পরীক্ষায় জানা গেল সেটির শিকড় আরও গভীরে। বহু বছর পর তাদের সেই বন্ধুত্বের মধ্যেই প্রকাশ পেল রক্তের সম্পর্কের অপ্রত্যাশিত সত্য।
সূত্র: বিবিসি