
ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ-উপস্থিতি এবং সমুদ্রের তলদেশে রাশিয়ার সম্ভাব্য গুপ্তচরবৃত্তি মোকাবিলার লক্ষ্যে এক যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে ‘অকাস’ (AUKUS) জোট। জোটের তিন সদস্য দেশ— যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া যৌথভাবে অত্যাধুনিক ‘ডুবোড্রোন’ বা মানববিহীন ডুবোযান (UUV) প্রযুক্তি তৈরি করতে যাচ্ছে।
সিঙ্গাপুরে আয়োজিত ‘শাংরি-লা ডায়ালগ’ নিরাপত্তা সম্মেলনে তিন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দেন। আগামী বছরের (২০২৭) মধ্যেই এই ড্রোনপ্রযুক্তি প্রস্তুত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অকাস চুক্তির ‘পিলার টু’ ও বিশাল বিনিয়োগ
২০২১ সালে সই হওয়া অকাস প্রতিরক্ষাচুক্তির ‘পিলার টু’ বা দ্বিতীয় ধাপের প্রথম প্রধান প্রকল্প হলো এই ডুবোড্রোন প্রযুক্তি। এই প্রকল্পের মোট ব্যয় সুনির্দিষ্টভাবে জানানো না হলেও যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি জানিয়েছেন, তাঁর দেশ এতে ১৫ কোটি পাউন্ড (২০ কোটি ১০ লাখ ডলার) বিনিয়োগ করবে। এই ড্রোনগুলোর জন্য বিশেষ সেন্সর ও আধুনিক অস্ত্রব্যবস্থাও তৈরি করা হবে।
যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, এই ডুবোড্রোনগুলোর মূল কাজ হবে:
অবকাঠামো রক্ষা: সমুদ্রের তলদেশের ইন্টারনেট কেব্ল ও পাইপলাইন রক্ষা করা।
সামরিক অভিযান: শত্রুপক্ষের ওপর হামলা চালানো এবং প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করা।
নজরদারি ও রসদ: সমুদ্রের গভীরে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং রসদ সরবরাহ করা।
ধীরগতির সমালোচনা ও ‘প্ল্যান বি’ বিতর্ক
সিঙ্গাপুরের এই সম্মেলনে অকাস প্রকল্পের কাজের ধীরগতি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা মেনে নেন ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি। তিনি বলেন, “অকাস চুক্তিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে শুধু কথাই বলেছি, কাজের কাজ কমই হয়েছে।” তবে বর্তমান সরকারগুলোর অধীনে কাজের গতি বেড়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এদিকে, চুক্তির ‘পিলার ওয়ান’-এর আওতায় অস্ট্রেলিয়ার জন্য পারমাণবিক সাবমেরিন নির্মাণের বিষয়টি ২০৪০-এর দশক পর্যন্ত ঝুলে যাওয়ায় দেশটিতে উদ্বেগ বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মার্লেস সাফ জানিয়ে দেন, এই সাবমেরিন প্রকল্প নিয়ে তাঁদের সামনে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই, কারণ তাঁদের হাতে কোনো ‘প্ল্যান বি’ বা বিকল্প পরিকল্পনা নেই।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আশ্বস্ত করে বলেছেন, ২০৩০-এর দশকে অস্ট্রেলিয়ার কাছে মার্কিন পারমাণবিক সাবমেরিন বিক্রির পরিকল্পনা এবং এ বছরের শেষের দিকেই মার্কিন নৌবাহিনীর প্রথম দলের অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছানোর বিষয়টি এখনো ‘ঠিক পথেই আছে’।
লক্ষ্য কি চীন ও রাশিয়া?
যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তাদের মতে, সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যুক্ত প্রায় ৬০টি কেব্লের ওপর রুশ জাহাজের আনাগোনা গত কয়েক বছরে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্যের উত্তরের জলসীমায় রাশিয়ার গোপন অভিযানের অভিযোগও তুলেছিল লন্ডন। অন্যদিকে, তাইওয়ান ও সুইডেনের জলসীমায় সমুদ্রের তলদেশের কেব্ল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পেছনে চীনের জাহাজের হাত রয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
যদিও এই ডুবোড্রোন প্রকল্প রাশিয়া ও চীনের সমুদ্রতলের কার্যক্রম মোকাবিলার জন্যই নেওয়া হয়েছে কি না— বিবিসির এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দেননি তিন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক যোগাযোগ সচল রাখা এবং আটলান্টিক, প্রশান্ত ও সুমেরু অঞ্চলে মিত্রদেশগুলোর প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতেই এই ড্রোন প্রযুক্তিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে।