
প্রকৃতির ভেতর লুকিয়ে আছে অসংখ্য বিস্ময়। কোনো প্রাণী রঙ বদলে শত্রুকে ফাঁকি দেয়, কেউ আবার অন্ধকারেই পথ খুঁজে নেয় নিঃশব্দে। আবার এমনও আছে, দেখতে এতটাই ছোট যে চোখ এড়িয়ে যায়, কিন্তু তার ক্ষমতা শুনলে মাথা ঘুরে যায়। ঠিক তেমনই এক মাছ, আকারে নখের সমান, কিন্তু এর তৈরি শব্দ শুনলে যেন কানে তালা লেগে যায়। এই ক্ষুদ্র প্রাণীর কাণ্ডকারখানা জানলে আপনিও অবাক হয়ে যাবেন।
মায়ানমারের ঘোলাটে মিঠা পানির স্রোতে বাস করা এই মাছটির নাম ড্যানিয়েনেলা সেরিব্রাম। দৈর্ঘ্য মাত্র ১২ মিলিমিটার, অর্থাৎ নখের চেয়েও ছোট। মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে এর মস্তিষ্কও সবচেয়ে ক্ষুদ্রগুলোর একটি। কিন্তু আকার দিয়ে একে বিচার করলে ভুল হবে, কারণ এর ক্ষমতা পুরো হিসাবই পাল্টে দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই মাছের পুরুষ সদস্যরা কাছ থেকে ১৪০ ডেসিবেলেরও বেশি শব্দ তৈরি করতে পারে। এত তীব্র শব্দ সাধারণত জেট ইঞ্জিন বা আতশবাজির বিস্ফোরণের সময় শোনা যায়। তুলনায়, হাতির মতো বিশাল প্রাণীর সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা প্রায় ১২৫ ডেসিবেলের কাছাকাছি।
বিজ্ঞানীরা খুঁজে পেয়েছেন, এই অস্বাভাবিক শব্দ তৈরির পেছনে রয়েছে এক অভিনব কৌশল। মাছটির শরীরে থাকা বিশেষ এক পাঁজরের হাড়কে অত্যন্ত দ্রুত টেনে আনে শক্তিশালী পেশী। এতে একটি কার্টিলেজ অংশে আঘাত লাগে, যা মুহূর্তেই সুইম ব্লাডারে সজোরে ধাক্কা দেয়। এই আঘাতের শক্তি এতটাই বেশি যে তা মাধ্যাকর্ষণের তুলনায় প্রায় দুই হাজার গুণ শক্তিশালী বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলেই তৈরি হয় তীব্র শব্দ তরঙ্গ।
গবেষকেরা উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে এই প্রক্রিয়াটি বিশ্লেষণ করেছেন। উচ্চগতির ভিডিও, সূক্ষ্ম স্ক্যান এবং জিনগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে, এটি মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে একেবারেই ব্যতিক্রমধর্মী শব্দ উৎপাদন পদ্ধতি।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, ঘোলা ও কম দৃশ্যমান পানিতে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া এবং সঙ্গী আকর্ষণের জন্যই পুরুষ মাছগুলো এই শব্দ ব্যবহার করে। চোখে দেখা না গেলেও শব্দই হয়ে ওঠে তাদের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম।
এই মাছটির স্বচ্ছ দেহ এটিকে আরও বিশেষ করে তুলেছে। জীবিত অবস্থাতেই এর শরীরের ভেতরের গঠন, এমনকি মস্তিষ্কও দেখা যায়। ফলে স্নায়ুবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন গবেষণায় এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি মডেল প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ছোট হলেও এই মাছ যেন মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির বিস্ময় কখনো আকার দেখে বিচার করা যায় না।