
ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে এক বড় ধরনের ওলটপালট ঘটিয়ে ইরানের সাথে সম্ভাব্য বড় সংঘাতের জন্য নিজেদের গোলাবারুদ সুরক্ষিত রাখতে স্বশাসিত তাইওয়ানের কাছে ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অস্ত্র বিক্রির সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক পদক্ষেপ এশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) মার্কিন সিনেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে আইনপ্রণেতাদের সামনে এই বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ করেন ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী সচিব হাং কাও। উল্লেখ্য, ঠিক এক সপ্তাহ আগেই বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তাইওয়ানের কাছে এই অস্ত্র বিক্রির বিষয়টি অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে উঠে এসেছিল।
সিনেটের প্রতিরক্ষা বিষয়ক বরাদ্দ উপকমিটির সামনে মার্কিন সামরিক কৌশল ব্যাখ্যা করে হাং কাও বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমরা সাময়িক বিরতি দিচ্ছি, যাতে নিশ্চিত করা যায় যে “এপিক ফিউরি” অভিযানের জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় গোলাবারুদ রয়েছে — এবং আমাদের কাছে সেগুলোর যথেষ্ট মজুত আছে।’
তিনি মার্কিন সিনেটরদের আরও আশ্বস্ত করে বলেন, ‘তবে আমরা সবকিছু নিশ্চিত করছি, এরপর প্রশাসন প্রয়োজন মনে করলে বৈদেশিক সামরিক বিক্রি আবারও চালু থাকবে।’
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, তাইওয়ানের কাছে পুনরায় এই সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির বিষয়ে যেকোনো ধরনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের একক এখতিয়ার থাকবে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ওপর।
যুদ্ধবিরতির মাঝেও যুদ্ধপ্রস্তুতি এবং তাইওয়ানের প্রতিক্রিয়া
বিগত ৮ এপ্রিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে সম্মুখ সংঘাত বন্ধ রয়েছে। তবে দুই পক্ষ এখনো পর্যন্ত কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারায় মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো সময় পুনরায় যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। আর সেই সম্ভাব্য সংঘাতের রসদ জোগাতেই তাইওয়ানের অস্ত্র আটকে দিল পেন্টাগন।
মার্কিন কংগ্রেস চলতি বছরের গত জানুয়ারি মাসেই তাইওয়ানের জন্য এই বিশাল সামরিক সহায়তা প্যাকেজটি অনুমোদন করেছিল। তবে মার্কিন আইন অনুযায়ী, এই অস্ত্র বিক্রির প্রক্রিয়াটিকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত সই বা অনুমোদনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
অস্ত্র সরবরাহ ঝুলে গেলেও তাইওয়ানের সংবাদমাধ্যম এফটিভি নিউজ (FTV News) জানিয়েছে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী চো জুং-তাই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দৃঢ়তার সাথে বলেছেন যে, নিজেদের সুরক্ষায় তাইওয়ান যেকোনো উপায়ে অস্ত্র ক্রয় প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।
মার্কিন সমর্থন নিয়ে সংশয় ও বেইজিংয়ের অবস্থান
আন্তর্জাতিক থিংক ট্যাংক 'ক্রাইসিস গ্রুপ'-এর উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে এই স্থগিতাদেশের নেতিবাচক দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, মার্কিন অস্ত্র সরবরাহে এই আকস্মিক বাধা:
‘তাইওয়ানে মার্কিন সমর্থন নিয়ে উদ্বেগ ও সংশয় বাড়িয়ে তুলবে এবং অদূর ভবিষ্যতে তাইওয়ান সরকারের জন্য অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বাজেটের অনুরোধ করা কঠিন করে তুলবে’।
এদিকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি নিয়ে বিস্তারিত দরকষাকষির কথা নিজের মুখে স্বীকার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। গত সপ্তাহে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের কাছে এই প্যাকেজ অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বেশ রহস্য রেখেই বলেছিলেন যে, তিনি এই প্যাকেজটি অনুমোদন, ‘করতেও পারেন’ বা ‘নাও করতে পারেন’।
আন্তর্জাতিক মহলে জানা কথা যে, বেইজিং শুরু থেকেই স্বশাসিত তাইওয়ানকে তাদের নিজস্ব অবিচ্ছেদ্য ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে। ফলে তাইপের প্রতি ওয়াশিংটনের যেকোনো ধরনের কূটনৈতিক ও অনানুষ্ঠানিক সামরিক সহায়তার তীব্র বিরোধিতা করে থাকে চীন। আল জাজিরার সূত্রমতে, মার্কিনদের এই নতুন অস্ত্র স্থগিতের সিদ্ধান্ত বেইজিংকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও তাইওয়ান প্রণালীতে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।