
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো ধরনের ঘাটতি যেন না থাকে—এমন আহ্বান জানিয়ে সরকারকে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের তাগিদ দিয়েছেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, “তারেক রহমানের নিরাপত্তা হতে হবে সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র। বেহুলার বাসরঘরের মতো যেন কোনো ছিদ্র না থাকে।”
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ফিরোজ আহমেদের স্ত্রী ফিরোজা আক্তারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন রিজভী। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর উদ্যোগে, তারেক রহমানের নির্দেশনা এবং ড. জুবাইদা রহমানের পরামর্শে রাজধানীর লালমাটিয়ায় শহীদ ফিরোজের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যান বিএনপি নেতারা।
রিজভী বলেন, তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিয়ে ইতোমধ্যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, যা দলকে উদ্বিগ্ন করেছে। তিনি জানান, “আমরা বারবার বলেছি—চেয়ারম্যানের নিরাপত্তা সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে সে মাত্রার প্রস্তুতি বা উদ্যোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি না।”
তিনি আরও বলেন, আগের দিন গুরুতর আহত পরিবারগুলোর সঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে এক মায়ের আকুতি ও হৃদয়বিদারক কান্না তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ওই সময়ই তিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে রিজভী ও আতিকুর রহমান রুমনকে নির্দেশ দেন—যে বাসায় পরিবারটি অবস্থান করছে, সেখানে গিয়ে দ্রুত সাক্ষাৎ করতে এবং তাদের সমস্যাগুলো বিস্তারিতভাবে জানতে।
বিএনপির এই সিনিয়র নেতা জানান, সেই নির্দেশনা অনুযায়ী তারা আজ ওই পরিবারের কাছে গেছেন এবং চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে কিছু সহায়তা পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি বলেন, শহীদ ফিরোজ রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানার বাসিন্দা। “৫ আগস্ট পলাতক ফ্যাসিবাদ বিদায়ের সময়ও নির্বিচারে মানুষ হত্যা করতে করতে গেছে—শহীদ ফিরোজ তারই আরেকটি নির্মম নিদর্শন।”
রিজভী জানান, বর্তমানে শহীদ ফিরোজের পরিবার রাজশাহী থেকে ঢাকায় এসে আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে এবং স্থায়ী যোগাযোগের জন্য ঠিকানা সংগ্রহ করা হয়েছে। বিএনপি পরিবার ও চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানান।
তিনি বলেন, শহীদ ফিরোজের দুই সন্তান রয়েছে। তাদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষাজীবন নিয়ে তাদের দাদি, অর্থাৎ ফিরোজের মা, গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে নোট নেওয়া হয়েছে এবং তা বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, শহীদ পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখা এবং তারা যেন কোনোভাবে বঞ্চিত না হন—এটাই তাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, শহীদ ফিরোজের রেখে যাওয়া সন্তানদের পড়াশোনা যাতে বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হবে।
আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, জনগণের ভোটে বিএনপি ক্ষমতায় এলে দলের চেয়ারম্যান যে অঙ্গীকার করেছেন, তা বাস্তবায়ন করা হবে। তিনি বলেন, “ক্ষমতায় গেলে প্রতিটি শহীদ পরিবার ও আহত পরিবারকে পুনর্বাসিত করা হবে এবং প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, একটি বৃহত্তর আদর্শ ও লক্ষ্য সামনে রেখে যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের আত্মত্যাগ নজিরবিহীন। এ ত্যাগকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অতীতের মতো ভবিষ্যতেও বিএনপি শহীদ পরিবারগুলোর পাশে থাকবে এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে তাদের পূর্ণ পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রিজভী বলেন, দলটি আশা করছে আগামী নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। তবে কিছু দৃষ্টান্ত ও নির্বাচন কমিশনের আচরণ তাদের মনে প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তিনি বলেন, শেক্সপিয়ারের ভাষায় বলতে হয়, `Something is rotten in the state of Denmark'—এই ধরনের কোনো পচনের গন্ধ তারা অনুভব করছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন কিছু হলে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা এবং গণতন্ত্রকামী রাজনৈতিক দল ও জনগণের আস্থায় ফাটল ধরবে। তবুও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ আচরণ করবে, যাতে ভোটাররা নির্বিঘ্নে, নির্ভয়ে ও বিনা সংশয়ে ভোট দিতে পারেন এবং কোনো সূক্ষ্ম কারচুপির সুযোগ না থাকে।
রিজভী বলেন, ভোটাররা যেন ১২ তারিখ সকালে নিশ্চিন্তে ঘুম থেকে উঠে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন—এটাই জনগণের প্রত্যাশা। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা অটুট রাখা এবং সরকারের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। অন্যথায় ইতিহাস ও জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
একটি দল নির্বাচনে অংশ নেবে না—এটি তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে রিজভী বলেন, এ বিষয়ে বিএনপির কিছু বলার নেই। তবে সরকারের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা, যাতে জনগণ বিশ্বাস করতে পারে যে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে এবং কোনো ধরনের অনিয়ম হবে না।
বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সংখ্যা ছড়াচ্ছে—কোথাও দুই হাজার, কোথাও দশ হাজার বলা হচ্ছে। কতজন এটি পাবেন, সে বিষয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। নির্দিষ্ট ও পরিষ্কার তথ্য যথাসময়ে জানানো হবে বলে তিনি জানান। নির্বাচন ও প্রচারণার সময় হওয়ায় এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করেননি তিনি।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “ফ্যামিলি কার্ড হোক কিংবা ফার্মার্স কার্ড—চেয়ারম্যান যে অঙ্গীকার করেছেন, জনগণ যদি বিএনপিকে রায় দেয়, তাহলে অক্ষরে অক্ষরে তা বাস্তবায়ন করা হবে। কোনো তথ্যগত গরমিল থাকবে না—সবকিছু হবে সুস্পষ্ট।”
এ সময় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন, সংগঠনের উপদেষ্টা আবুল কাশেম ও ইঞ্জিনিয়ার মোস্তফা-ই-জামান সেলিম, সদস্য সচিব কৃষিবিদ মোকছেদুল মোমিন মিথুন, সদস্য মাসুদ রানা লিটন, মুস্তাকিম বিল্লাহ, শাকিল আহমেদ, ফরহাদ আলী সজীব ও শাহাদাত হোসেন, বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম, রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহবুবুল ইসলাম মাহবুব, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সভাপতি ডা. জাহিদুল কবির জাহিদ, স্বেচ্ছাসেবক নেতা তুষার আহমেদ, ছাত্রদল নেতা মিসবাউল আলম, মশিউর রহমান মহান, আব্দুল্লাহ আল মিসবাহসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।