
ঢাকায় বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সংসদে বাজেট আলোচনায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর বা টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবকে ঘিরে উদ্বেগ ও সমালোচনা ওঠে আসে। বিভিন্ন সদস্য বলেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারেন এবং ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে যেতে পারে।
সিলেট-৫ আসনের খেলাফত মজলিশের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবুল হাসান বলেন, ব্যাংক হিসাব খোলা বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য উদ্বেগ তৈরি করছে। তিনি সংসদে বলেন, ‘ব্যাংক হিসাব বা ব্যবসায়িক নিবন্ধনের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।’ একই সঙ্গে তিনি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর কর বাড়ানোর উদ্যোগ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।
বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি আইসিটি খাতের উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মিডডে মিল চালু, তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ এবং ফ্রিল্যান্সারদের আয় করমুক্ত রাখার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর কর চাপ বাড়ানোর উদ্যোগকে তিনি পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
তিনি আরও বলেন, দেশে প্রায় চার হাজার কওমি মাদ্রাসা রয়েছে, যেখানে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষক এবং ৬০ থেকে ৭০ লাখ শিক্ষার্থী থাকলেও বাজেটে এ শিক্ষাধারার জন্য কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সাজেদা আস সামাদ বলেন, বাজেটে ১০টি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সাফল্য পরিমাপের সূচক স্পষ্ট করা হয়নি। তিনি ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অদক্ষতার অভিযোগ তোলেন।
যশোর-৬ আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য মো. মোক্তার আলী বাজেটকে কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও বেশ কিছু দুর্বলতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। ইংরেজিতে দেওয়া বক্তব্যে তিনি কর-জিডিপি অনুপাতের তুলনায় রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাকে ‘অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বাজেট ঘাটতি, ঋণনির্ভরতা, মূল্যস্ফীতি ও দুর্নীতির ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেন।
নীলফামারী-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার সরকার বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার কারণে সাধারণ মানুষের ওপর পরোক্ষ করের চাপ বাড়তে পারে।
নওগাঁ-২ আসনের সদস্য মো. এনামুল হক কৃষি খাতে ভর্তুকি ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, সুবিধা প্রকৃত প্রান্তিক কৃষকের কাছে পৌঁছায় না। তিনি সার, বীজ ও সেচে সরাসরি ভর্তুকি দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
নাটোর-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবি জানান এবং কৃষিতে ‘সার সিন্ডিকেট’ ভেঙে কৃষকদের ন্যায্য সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ফ্রিল্যান্সার, নারী উদ্যোক্তা ও তরুণদের জন্য বাজেট ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। তিনি বলেন, কনটেন্ট ক্রিয়েশন থেকে আয়ের ওপর করমুক্ত সুবিধা এবং ফ্রিল্যান্সিং সেবায় ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
তিনি আরও বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের করমুক্ত লেনদেনসীমা বাড়ানো এবং ডে-কেয়ার সেন্টার, পিংক বাস সার্ভিস ও নিরাপত্তা উদ্যোগ প্রশংসনীয়। একই সঙ্গে তিনি স্যানিটারি ন্যাপকিনকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে এর মূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য সুরাইয়া জেরিন নারী ও শিশু উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ও কর্মজীবী নারীদের সুবিধার প্রশংসা করেন এবং গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ, বেসরকারি খাতে ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি ও গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য স্যানিটারি সামগ্রীতে ভর্তুকির প্রস্তাব দেন।
মানসুরা আক্তার বলেন, ফ্যামিলি কার্ড নারীর নামে দেওয়ার উদ্যোগ অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বড় পদক্ষেপ। তিনি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অনলাইন হয়রানি মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
মমতাজ আলো বলেন, ৪১ লাখ পরিবারে ফ্যামিলি কার্ড এবং ৪২ লাখ কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড সামাজিক সুরক্ষা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি প্রবাসীদের জন্য ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর প্রস্তাবও দেন।
সরকারি দলের সদস্যরা বলেন, বাজেটের লক্ষ্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা। সিলেট-৩ আসনের সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল মালিক বলেন, রাজস্ব আহরণ বাড়াতে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে করের আওতায় আনতে হবে এবং টিআইএন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে।
কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য শরিফুল আলম বলেন, বাজেট সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। তিনি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
ঢাকা-১৮ আসনের সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বরাদ্দকে ইতিবাচক বলেন। নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের মো. নজরুল ইসলাম আজাদ স্টার্টআপ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য রেজেকা সুলতানা বলেন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষি খাতে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে বাজেট জনকল্যাণমুখী হয়েছে।
বাজেট আলোচনায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন সদস্য নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন চাহিদাও তুলে ধরেন, যেখানে সড়ক, রেলওয়ে, নদীভাঙন রোধসহ নানা অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি আসে।