
দেশের অনলাইন জগতের বড় একটি অংশ প্রকৃত ব্যবহারকারীর কার্যক্রম নয়, বরং স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত ‘বট’নির্ভর কার্যকলাপ বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
তাঁর ভাষ্য, দেশের মোট সাইবার ট্রাফিকের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই এ ধরনের কৃত্রিম ইন্টারঅ্যাকশন। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য বা তথাকথিত ‘সাইবার বুলিং’ বিশ্লেষণে বাস্তবতা বুঝতে ভুল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বুধবার (৬ মে) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে সাইবার নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবস্থাপনা নিয়ে আয়োজিত এক সংলাপে এসব কথা বলেন তিনি। কয়েকটি সংস্থার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ আলোচনায় দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তি খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন।
রেহান আসিফ আসাদ বলেন, অনলাইনে যেসব মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া বা যোগাযোগ দেখা যায়, তার বড় অংশই স্বাভাবিক ব্যবহারকারীদের তৈরি নয়। প্রকৃত ও কৃত্রিম ট্রাফিক আলাদা করতে না পারলে সমস্যার প্রকৃতি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বড় প্ল্যাটফর্মগুলোও ‘বট অ্যাকাউন্ট’ সমস্যার বিষয়টি স্বীকার করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক অ্যাকাউন্ট সরিয়ে ফেলেছে।
দেশের সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে বলেও স্বীকার করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা। তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই নিরাপত্তা ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের বড় অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সংরক্ষিত থাকায় কেবল সরকারি অবকাঠামো সুরক্ষিত করলেই যথেষ্ট হবে না। এ বিষয়ে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
সংলাপে ইউনেসকোর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ডিজিটাল গভর্ন্যান্সবিষয়ক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ জোয়ান বারাতা বলেন, সাইবার অপরাধ দমনের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করার প্রবণতা উদ্বেগজনক হতে পারে। তাঁর মতে, অনলাইনের জন্য আলাদা করে অতিরিক্ত অপরাধ সংজ্ঞা তৈরি করলে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ বাড়ে। তিনি বলেন, ‘যা অফলাইনে অবৈধ, তা অনলাইনেও অবৈধ—এর বেশি কিছু নয়, কমও নয়।’
জোয়ান বারাতা আরও বলেন, ‘গুজব ছড়ানো’ বা ‘অসত্য তথ্য প্রচার’-এর মতো বিস্তৃত ও অস্পষ্ট শব্দ আইনে যুক্ত হলে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। একই সঙ্গে সাইবার আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ইউনেসকোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি সুজান ভাইজ বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার পাশাপাশি সমাজের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। তবে সেই সীমাবদ্ধতা যেন মানুষের অধিকার খর্বের হাতিয়ার না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে। তাঁর মতে, শুধু আইন করাই যথেষ্ট নয়, কার্যকর ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়াও প্রয়োজন, যাতে বিরোধ বা সংকট দেখা দিলে ন্যায্য সমাধানের সুযোগ থাকে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, বিটিআরসি সরাসরি কোনো কনটেন্টের বিচার করে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুরোধে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। তিনি জানান, গত এক বছরে প্রায় ২৭ হাজার পোস্ট বা লিংক অপসারণের অনুরোধ করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৬৩ শতাংশ কার্যকর হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থাও অনলাইন সহিংসতা, প্রতারণা ও বিভ্রান্তি বাড়াতে পারে। তাই প্রযুক্তি, আইন ও জনসচেতনতার সমন্বিত উন্নয়ন জরুরি।
আলোচনায় আলোকচিত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শহিদুল আলম বলেন, এখন আর প্রশ্ন ‘নিয়ন্ত্রণ হবে কি না’ নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ কীভাবে করা হবে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এমন একটি কাঠামো প্রয়োজন যেখানে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন না করেই জবাবদিহিমূলক সাইবার শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সংলাপে আরও বক্তব্য দেন নাগরিক কোয়ালিশনের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, আইনজীবী প্রিয়া আহসান চৌধুরী, নাবিলা ইদ্রিস, ফারুক ওয়াসিফসহ বিভিন্ন অঙ্গনের প্রতিনিধিরা।