
উৎপাদন ও বিনিয়োগে নতুন গতি আনতে আসন্ন জাতীয় বাজেটে একাধিক খাতে কর ও শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়াতে করদাতার পরিধি সম্প্রসারণ এবং কর ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। ফলে একদিকে শিল্প ও ব্যবসা খাত আশাবাদী হলেও অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হতে পারে। যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বেশি। একই সময়ে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকায় সরকারের সামনে রাজস্ব সংগ্রহের বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
বাজেট-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র বলছে, এবার উৎপাদনমুখী শিল্প ও বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহ দেওয়াই সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ মন্দা, শিল্প সম্প্রসারণের ধীরগতি এবং কর্মসংস্থানের চাপ মোকাবিলায় করনীতিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায় সরকার।
দেশীয় শিল্প সুরক্ষার অংশ হিসেবে মোবাইল ফোন, ফ্রিজ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম এবং সিসিটিভি ক্যামেরা উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর বিদ্যমান কর ও শুল্ক সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে দেশে উৎপাদিত মোবাইল ফোনের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাবও থাকছে।
একজন অর্থনীতিবিদ একটি গণমাধ্যমকে বলেন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ বর্তমানে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে বেসরকারি খাতকে উৎসাহ দিতে কর ও শুল্ক সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু করছাড় নয়, ব্যাংক ঋণের সুদের হার, জ্বালানি সরবরাহ, লাইসেন্স ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ার জটিলতা কমানোর মতো বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
আরেক অর্থনীতিবিদ একটি গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের রাজস্ব কাঠামো এখনো মূলত পরোক্ষ করনির্ভর। তাই রাজস্ব বাড়াতে আয়করের আওতা সম্প্রসারণ, করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর পরিপালন নিশ্চিত করার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের জন্যও বড় ধরনের প্রণোদনার পরিকল্পনা রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত আয়কর অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম আমদানি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, চার্জিং অবকাঠামো এবং পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি উৎপাদনেও কর-শুল্ক সুবিধা অব্যাহত থাকতে পারে।
রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক কেবল, স্যানিটারি পণ্য ও কিছু টেক্সটাইল খাতকে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের জন্য কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ব্যবস্থাও চালুর চিন্তা করছে সরকার।
তথ্যপ্রযুক্তি ও উদ্ভাবন খাতেও একাধিক সুবিধা থাকছে। আইটিসহ বিভিন্ন ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ে কর অব্যাহতি, কনটেন্ট নির্মাতাদের আয়ের ওপর কর ছাড় এবং স্টার্টআপ ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের টার্নওভার কর শূন্য শতাংশ নির্ধারণের প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি কম্পিউটার যন্ত্রাংশ ও ডিজিটাল ডিভাইস উৎপাদনের উপকরণ আমদানিতে শুল্ক সুবিধা বাড়ানো হতে পারে।
অন্যদিকে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে করজাল সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে। আগামী অর্থবছর থেকে ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর বাধ্যতামূলক করা হতে পারে। নির্দিষ্ট ক্ষমতার মোটরসাইকেল নিবন্ধন, খুচরা ব্যবসা এবং পণ্য বিতরণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও নতুন কর ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ রয়েছে। এছাড়া ছোট ব্যবসার জন্য নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট আদায়ের ব্যবস্থাও চালু হতে পারে।
তবে সাধারণ মানুষের জন্য কিছু স্বস্তির ব্যবস্থাও থাকছে। ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষি ও ভোগ্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানো, শিশুখাদ্যের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস, খেজুর ও মসলার ওপর কিছু শুল্ক প্রত্যাহার এবং ভোজ্যতেল উৎপাদনে কর সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্কমুক্ত সীমা বৃদ্ধি এবং মেট্রোরেলের টিকিটে ভ্যাট অব্যাহতি বহাল রাখার প্রস্তাবও বাজেটে থাকতে পারে। তবে তামাকজাত পণ্যে কর বৃদ্ধি, কিছু আমদানিপণ্যের শুল্ক বাড়ানো এবং নির্মাণসামগ্রীর ওপর অতিরিক্ত ভ্যাট আরোপের কারণে কয়েকটি খাতে ব্যয় বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, করছাড় ও প্রণোদনা বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে ব্যবসা সহজীকরণ, ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা, নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর বিকল্প নেই।