
১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। জার্মানির মিউনিখে তখন অলিম্পিকের আসর। বিশ্বের নানা প্রান্তের ক্রীড়াবিদরা ব্যস্ত প্রতিযোগিতায়। চারদিকে উৎসবের আবহ। কিন্তু ভোর হওয়ার আগেই অলিম্পিক ভিলেজের একটি ভবনে ঘটে যায় এমন ঘটনা, যা বদলে দেয় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ, জিম্মি সংকট এবং গোয়েন্দা যুদ্ধের ইতিহাস।
সেদিন ভোরে আটজন ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সদস্য অলিম্পিক ভিলেজে প্রবেশ করে ইসরায়েলি দলের হোটেল লবিতে হামলা চালায়। তারা ইসরায়েলি দলের দুই সদস্যকে হত্যা করে এবং আরও নয়জনকে জিম্মি করে। হামলাকারীরা নিজেদের পরিচয় দেয় ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ সংগঠনের সদস্য হিসেবে।
ইসরায়েল- অবৈধ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ফিলিস্তিনের প্রতি নিপীড়ণ-গণহত্যা, ভূমি থেকে উৎখাত এবং দখলের মতো ঘটনা ধারাবাহিকভাবেই ঘটে চলেছে। নিজস্ব কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক মহলের কাছ থেকে কোনো সুবিচার না পেয়ে কিছু ফিলিস্তিনি সন্ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে নিজেদের অধিকার আদায়ের নীতি অবলম্বন করে। কিন্তু নিজেদের ভূ-খন্ড থেকে দূরে অলিম্পিকের মতো একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর কেন তাদের লক্ষ্য হলো?
এর উত্তর খুঁজতে হলে কয়েক বছর পেছনে যেতে হয়।
‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ নামটির পেছনেও আছে রক্তাক্ত ইতিহাস
১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জর্ডানের সামরিক বাহিনী ও ফিলিস্তিনি গেরিলাদের মধ্যে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয় (যা 'কালো সেপ্টেম্বর' বা Black September নামে পরিচিত) এবং ফিলিস্তিনিদের জর্ডান থেকে বিতাড়িত করা হয়। এর প্রতিক্রিয়া ও প্রতিশোধ হিসেবেই ফাতাহ-এর একটি গোপন শাখা হিসেবে এই 'ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর' গোষ্ঠী গঠিত হয় এবং তারা ইসরায়েল ও পশ্চিমা স্বার্থে আঘাত করা শুরু করে।
সেই প্রেক্ষাপটেই ‘ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর’ নামে সংগঠনটির উত্থান। এটি ফাতাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত একটি ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত ছিল। তাদের কর্মকাণ্ডের একটি বড় লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনের প্রশ্নকে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে বিশ্ববাসী সেটিকে আর উপেক্ষা করতে না পারে। আর ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিক তাদের জন্য ছিল সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের এক বিশাল মঞ্চ।
মিউনিখ হত্যাকাণ্ডের মাত্র দুই দিন পর ইসরায়েল সিরিয়া ও লেবাননে পিএলও-সংশ্লিষ্ট ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায়। লক্ষ্য ছিল ফিলিস্তিনি সশস্ত্র অবকাঠামো। এই হামলা ছিল মিউনিখের ঘটনার তাৎক্ষণিক সামরিক প্রতিক্রিয়ার অংশ। কিন্তু ইসরায়েলের প্রতিশোধ সেখানেই থামেনি।
শুরু হলো এক গোপন শিকারের খেলা
ইসরায়েলি নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেয়, মিউনিখ হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও সংগঠকদের খুঁজে বের করা হবে। প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার এ জন্য একটি ছোট সরকারি কমিটি গঠন করেন। পরে ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত ও লক্ষ্যবস্তু করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই গোপন অভিযানের নাম ইতিহাসে পরিচিত হয় ‘অপারেশন র্যাথ অব গড’ বা ‘ঈশ্বরের ক্রোধ’ নামে।
অভিযানের লক্ষ্য ছিল শুধু মিউনিখে সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা নয়; ইসরায়েলি গোয়েন্দারা হামলার পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত বলে সন্দেহ করা ব্যক্তিদেরও অনুসরণ করতে থাকে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলে।
এর ফলে মিউনিখের পর শুরু হয় এক দীর্ঘ গোপন গোয়েন্দা যুদ্ধ—একদিকে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠনের সদস্যরা আত্মগোপনে, অন্যদিকে তাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা।
অভিযানটি বহু বছর ধরে চলেছিল এবং এর লক্ষ্যবস্তুদের মধ্যে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর ও পিএলও-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি নিহত হন। তবে এই প্রতিশোধ অভিযান নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়—বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে লক্ষ্যবস্তু হত্যার বৈধতা, নিরপরাধ ব্যক্তিদের ক্ষতির ঝুঁকি এবং প্রতিশোধের সীমা নিয়ে।
নিখুঁত হিসাব করেও নিরপরাধী হত্যা
এই গোপন অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ছিল নরওয়ের লিলেহ্যামার হত্যাকাণ্ড। সেখানে ইসরায়েলি এজেন্টরা ভুল ব্যক্তিকে মিউনিখ হামলার সঙ্গে জড়িত বলে শনাক্ত করে হত্যা করে। পরে জানা যায়, নিহত ব্যক্তি ছিলেন মরক্কোর এক ওয়েটার, যিনি হামলার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। আর এখানেই মিউনিখের গল্প আরও জটিল হয়ে যায়। একদিকে ইসরায়েলের কাছে এটি ছিল নিহত ১১ নাগরিকের জন্য জবাব দেওয়ার অভিযান; অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্র কি বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে বিদেশের মাটিতে হত্যাকাণ্ড চালাতে পারে?
মিউনিখ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
১৯৭২ সালের মিউনিখ হামলা শুধু ১১ ইসরায়েলির প্রাণ কেড়ে নেয়নি। এটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদকে টেলিভিশনের সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর ঘরের ভেতরে নিয়ে আসে। সেই সময় কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনে জিম্মি সংকটের দৃশ্য দেখছিল। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের জন্যও এটি ছিল এক নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা—একটি সন্ত্রাসী ঘটনা বিশ্বজুড়ে সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে।
এরপর বিশ্বজুড়ে বিমানবন্দর, ক্রীড়া আয়োজন ও গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু হয়। ইসরায়েলও নিজস্ব সন্ত্রাসবিরোধী সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে এগোয়। পরবর্তী বছরগুলোতে জিম্মি উদ্ধার ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের জন্য বিশেষায়িত কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও মিউনিখের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
সামনে আসে একটি প্রশ্নও—একটি রাজনৈতিক সংকট যখন অস্ত্র, জিম্মি ও হত্যাকাণ্ডের পথ নেয়, তখন তার প্রতিক্রিয়া কোথায় গিয়ে থামে?
১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মিউনিখে যে গুলি চলেছিল, তার শব্দ অলিম্পিক ভিলেজেই থেমে থাকেনি। পরবর্তী বহু বছর ধরে তার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে মধ্যপ্রাচ্যে, ইউরোপের বিভিন্ন শহরে এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা যুদ্ধের অন্ধকার জগতে।
একটি অলিম্পিক আসরকে বিশ্বমঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছিল ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর। কিন্তু তাদের সেই অভিযান শেষ পর্যন্ত এমন এক পাল্টা অভিযানের দরজা খুলে দেয়, যা মিউনিখের ঘটনার বহু বছর পরও ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত গোপন প্রতিশোধমূলক অভিযানগুলোর একটি হয়ে আছে। এমনকি সেই ধারাবাহিকতায় নিরাপত্তা নিশ্চিতের নামে ফিলিস্তিনিদের ওপর ধারাবাহিক গণহত্যা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল।
এমনকি এই নিবন্ধ লেখাকালীন ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে চলছে উচ্ছেদ অভিযান। অবৈধ দখলদার ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা রাষ্ট্রীয় মদদে ফিলিস্তিনিদের ওপর চালাচ্ছে নির্দয় অত্যাচার। গাজা উপত্যকায় চলছে ড্রোন ও বিমান হামলা।