
রাজধানীর অন্যতম জনবহুল এলাকা মোহাম্মদপুর এখন সংঘবদ্ধ অপরাধ, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও রক্তক্ষয়ী আধিপত্য বিস্তারের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পুরো মোহাম্মদপুর এলাকা ভাগ করে অন্তত ১৬টি গ্যাং নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বলয় তৈরি করেছে। এসব গ্যাংয়ে সক্রিয় সদস্যের সংখ্যা ২৫১ জনেরও বেশি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত অভিযান, গ্রেফতার এবং পুলিশের কড়াকড়ি সত্ত্বেও অপরাধের লাগাম টানা যাচ্ছে না। বরং খুন, কুপিয়ে জখম, ছিনতাই, মাদক বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি এখন অনেকটাই নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ফলে আতঙ্কে দিন কাটছে সাধারণ মানুষের।
দিনদুপুরে কুপিয়ে হত্যা
গত ১২ এপ্রিল বিকেলে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী বেড়িবাঁধ এলাকায় প্রকাশ্যে ঘটে এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক যুবক প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালাচ্ছেন। পেছনে ধাওয়া করছে কয়েকজন। কিছুক্ষণ পর তাকে ধরে রাস্তায় ফেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত যুবকের নাম ইমন, যিনি ‘এলেক্স ইমন’ গ্রুপের সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিপক্ষ ‘আরমান-শাহরুখ’ গ্রুপের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
এর মাত্র চারদিন পর, ১৬ এপ্রিল আবারও খুনের ঘটনা ঘটে। বাসা থেকে ডেকে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয় আসাদুল হক ওরফে লম্বু আসাদুলকে। পুলিশ বলছে, আর্থিক লেনদেন ও মারামারির জেরেই এ হত্যাকাণ্ড।
১৬ গ্যাংয়ের দখলে এলাকা
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ভাগ করে নিয়েছে কয়েকটি বড় গ্যাং। এর মধ্যে রয়েছে—পাটালী গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, আনোয়ার গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, আর্মি আলমগীর গ্রুপ, নবী গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, এলেক্স গ্রুপ, আকবর গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, আশরাফ গ্রুপ, স্টার বন্ড গ্রুপ, টক্কর গ্রুপ, ঘুটা দে গ্রুপসহ আরও কয়েকটি চক্র।
এসব গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে রায়েরবাজার, বেড়িবাঁধ, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান, নবোদয়, বসিলা রোড, মোহাম্মদিয়া হাউজিং, শ্যামলী সংলগ্ন এলাকা ও আশপাশের বিস্তীর্ণ অংশ।
অপরাধের তালিকায় সবই আছে
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা মূলত—
মাদক বিক্রি ও সরবরাহ
চাঁদাবাজি
ছিনতাই ও ডাকাতি
জমি দখল
ইভটিজিং ও নারী হয়রানি
রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ে ভাড়াটে লোক সরবরাহ
আধিপত্য বিস্তার নিয়ে হামলা ও খুন
এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা এলাকায় ভয়ভীতি সৃষ্টি করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে।
এক সপ্তাহে ১৬৮ গ্রেফতার
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১৬ থেকে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত তেজগাঁও বিভাগের ছয় থানায় মোট ৪২৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে শুধু মোহাম্মদপুর থানাতেই গ্রেফতার করা হয় ১৬৮ জনকে।
তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার ইবনে মিজান জানিয়েছেন, মোহাম্মদপুরে প্রায় প্রতিদিনই বিশেষ অভিযান চলছে। রায়েরবাজার, বসিলা, ঢাকা উদ্যান, চাঁদ উদ্যান এলাকায় নিয়মিত চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, “বড় কিছু ঘটনায় দেখা গেছে বাইরে থেকে লোক এসে অপরাধ করে চলে গেছে। তাদেরও আমরা ঢাকার বাইরে থেকে গ্রেফতার করেছি।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, পেছনে আছে প্রভাবশালীরা
এলাকাবাসীর দাবি, এসব গ্যাংয়ের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া রয়েছে। ফলে পুলিশ অনেক সময় চাইলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে না।
একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যারা ধরা পড়ে, তারা কিছুদিন পর জামিনে বেরিয়ে আবার আগের মতো দাপট দেখায়। তাই কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।”
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু গ্রেফতার করলেই হবে না। গ্যাংগুলোর অর্থের উৎস, অস্ত্র সরবরাহকারী, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক এবং আশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “মোহাম্মদপুরকে বিচ্ছিন্ন অপরাধ দ্বীপের মতো মনে হয়। এখানে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক ও শক্তিশালী পরিকল্পনা দরকার। শুধু হঠাৎ অভিযান দিয়ে সমাধান হবে না।”
আতঙ্কে সাধারণ মানুষ
স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর অনেক সড়কে চলাচলই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা দলবেঁধে ঘোরাফেরা করে, মোটরসাইকেলে মহড়া দেয়, ছোটখাটো বিষয়েও মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে।
সাধারণ মানুষ বলছেন, দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে মোহাম্মদপুরে বড় ধরনের আইনশৃঙ্খলা সংকট তৈরি হতে পারে।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে এমন অপরাধ সাম্রাজ্য শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়, এটি পুরো নগর নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। মোহাম্মদপুরকে নিরাপদ করতে হলে নিয়মিত অভিযান, দ্রুত বিচার, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ এবং তরুণদের গ্যাং সংস্কৃতি থেকে ফেরাতে সামাজিক উদ্যোগ—সবকিছুর সমন্বিত প্রয়াস জরুরি।