
কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে বিএসএফের জোরপূর্বক পুশইনের শিকার হয়ে খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘ ৯৬ ঘণ্টা আটকে থাকার পর অবশেষে মুক্ত হলেন এক শিশুসহ একই পরিবারের চার সদস্য। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দীর্ঘ টানাপোড়েন শেষে আন্তর্জাতিক সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে তাদের অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। উদ্ধারের পর আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাদেরকে রৌমারী থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। তবে এই চারজন উদ্ধার হলেও সীমান্তের ওপারে জিরো লাইনে এখনও আরও পাঁচজন নাগরিক চরম খাদ্যসংকট ও মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
আজ বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দুপুরে রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাওসার আলী গণমাধ্যমকে উদ্ধারের এই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। উদ্ধার হওয়া চারজন হলেন— বেলাল হোসেন (২৮), তার স্ত্রী সুমি আক্তার (২৬) এবং তাদের দুই অবুঝ সন্তান ফাইমা (৫ মাস) ও ফাতেমা আক্তার (৪)।
পুলিশ প্রশাসন ও সীমান্ত এলাকার স্থানীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, গতকাল বুধবার (১৭ জুন) রাত সাড়ে ১১টার দিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ব্যাটালিয়ন পর্যায়ে একটি জরুরি যৌথ পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠক শেষে মূলত মানবিক দিক বিবেচনা করে শূন্যরেখায় টানা চারদিন আটকে থাকা একই পরিবারের এই চার সদস্যকে নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং পরবর্তীতে থানায় হস্তান্তর করে বিজিবি।
এর আগে গত রোববার (১৪ জুন) ভোররাতের দিকে আন্তর্জাতিক ১০৬০ মেইন পিলারের ১-এস সাব-পিলারের পাশ দিয়ে ভারতের আসাম রাজ্যের দক্ষিণ সালমারা মানকারচর জেলার ঝালোরচর ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা অবৈধ উপায়ে ১ জন নারী, ৩ জন পুরুষ ও ২ জন শিশুসহ মোট ৬ নাগরিককে জোরপূর্বক বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঠেলে দেওয়ার (পুশইন) চেষ্টা চালায়। ওই সময় বিজিবির কঠোর অবস্থান ও স্থানীয় সীমান্তবাসীর তীব্র বাধায় বিএসএফের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং তারা সীমান্তের শূন্যরেখার ভারতীয় অংশে আটকা পড়েন।
অন্যদিকে, ঠিক একই রাতে আন্তর্জাতিক ১০৬৬ মেইন পিলারের কাছাকাছি এলাকা দিয়ে বিএসএফ সদস্যরা আরও ৩ জন নাগরিককে একইভাবে পুশইনের চেষ্টা করলে বিজিবির টহল দলের কড়া তৎপরতায় তারাও শূন্যরেখায় আটকে যান। ফলে সব মিলিয়ে দুই শিশুসহ মোট ৯ জন নাগরিক কাঁটাতারের বেড়ার বাইরে খোলা আকাশের নিচে আটকা পড়ে অবর্ণনীয় কষ্টের শিকার হন।
সীমান্তের জিরো লাইনে খোলা আকাশের নিচে ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে পরিবারটির দুই দুগ্ধপোষ্য শিশু চরম অসুস্থ হয়ে পড়া এবং তাদের এই অমানবিক জীবনযাপনের ছবি ও সংবাদ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হলে তা দুই দেশের বিজিবি ও বিএসএফের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল বুধবার (১৭ জুন) বিজিবি-বিএসএফের একটি যৌথ মেডিকেল টিম শূন্যরেখায় গিয়ে অসুস্থ শিশুদের প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি ওষুধ প্রদান করে। পরবর্তীতে ওই রাতেই দ্বিপক্ষীয় সফল পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে এই দম্পতি ও তাদের দুই শিশুকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
সার্বিক আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে রৌমারী থানার ওসি মো. কাওসার আলী বলেন, বিজিবি কর্তৃক শিশুসহ দম্পতিকে রাতে থানায় হস্তান্তরের পর আইনি প্রক্রিয়া ও পরিচয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করা হয়। এরপর রাতেই তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে বেলাল হোসেনের মায়ের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।