
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভিনদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে লাতিন আমেরিকার দুই দেশ বলিভিয়া ও কলম্বিয়ার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এক নজিরবিহীন কূটনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। বলিভিয়ার রাজধানী লাপাজসহ প্রধান প্রধান শহরগুলোতে চলমান তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই টানাপোড়েনের জেরে বুধবার (২০ মে) দেশ দুটি একে অপরের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করেছে।
বলিভিয়া কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের দেশে চলমান গণবিক্ষোভকে 'গণ-অভ্যুত্থান' আখ্যা দিয়ে কলম্বিয়ার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো বলিভিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকারচর্চা করেছেন। এই গুরুতর অভিযোগে লাপাজে নিযুক্ত কলম্বিয়ার রাষ্ট্রদূত এলিজাবেথ গার্সিয়াকে অবিলম্বে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয় বলিভিয়া। এর জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে কলম্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বোগোতায় নিযুক্ত বলিভিয়ার রাষ্ট্রদূত আরিয়েল পার্সি মোলিনা পিমেন্টেলকে বহিষ্কারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়।
কলম্বিয়া প্রেসিডেন্টের মন্তব্য ও বলিভিয়ার সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন
ডানপন্থী সরকারগুলোর কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো গত সপ্তাহে বলিভিয়ার সরকারবিরোধী আন্দোলনকে একটি গণ-অভ্যুত্থান বলে মন্তব্য করেছিলেন এবং এই রাজনৈতিক সংকট সমাধানে নিজে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দেন। তার এই অবস্থানকে ভালোভাবে নেয়নি লাপাজ।
কলম্বিয়ার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলিভিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের দেশের অনধিকারচর্চা প্রতিহত করা এবং পারস্পরিক আন্তর্জাতিক শ্রদ্ধা বজায় রাখতেই তারা এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
তবে এই বহিষ্কারের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে বলিভিয়া সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন গুস্তাভো পেত্রো। তিনি দাবি করেন, এই পদক্ষেপ মূলত বলিভিয়া প্রশাসনের চরমপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার একটি স্পষ্ট প্রমাণ। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অনতিবিলম্বে সংলাপের আয়োজন না করা হলে সেখানে ‘গণহত্যা’ সংঘটিত হতে পারে।
বলিভিয়ার অর্থনৈতিক সংকট ও চলমান বিক্ষোভের নেপথ্য
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট:
দীর্ঘ ৪ দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে গত বছর বলিভিয়ায় ক্ষমতায় আসেন নতুন উদার ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ।
অর্থনৈতিক সংকট:
দেশের ডলারের রিজার্ভ ধরে রাখার জন্য রদ্রিগো পাজ সরকার দীর্ঘদিনের প্রচলিত রাষ্ট্রীয় জ্বালানি ভর্তুকি সম্পূর্ণ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়।
বিক্ষোভের কারণ:
সরকারের এই অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটির কৃষক, সাধারণ শ্রমিক ও খনিশ্রমিকেরা রাজপথে টানা বিক্ষোভ করছেন।
রদ্রিগো পাজের এই জয়ে বলিভিয়ায় সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের হাত ধরে শুরু হওয়া টানা দুই দশকের সমাজতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটেছিল। বর্তমানে রদ্রিগো পাজ প্রশাসন এই গণবিক্ষোভকে সাবেক বামপন্থী প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের একটি ‘অভ্যুত্থান চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছে। উল্লেখ্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট মোরালেস বর্তমানে এক অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে পাচারের মামলায় আদালতের পলাতক আসামি হিসেবে অভিযুক্ত।
এদিকে, বর্তমান রদ্রিগো পাজ সরকারের প্রতি নিজেদের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকেও এই বিক্ষোভকে একটি ‘অভ্যুত্থান চেষ্টা’ হিসেবেই আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তবে সরকারি অনমনীয়তায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে। গত সোমবার (১৮ মে) লাপাজ শহরে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত হাজারো বিক্ষোভকারীর সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের কয়েক ঘণ্টাব্যাপী দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যা দেশটির সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
সূত্র: এএফপি