
পশ্চিম আফ্রিকার অন্যতম শীর্ষ ঋণগ্রস্ত দেশ সেনেগালে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর এক নাটকীয় পটপরিবর্তন ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী ওসমান সোনকোকে তার পদ থেকে বরখাস্ত করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট বাসিরু দিওমায়ে ফায়ে। প্রধানমন্ত্রীর অপসারণের পাশাপাশি বর্তমান সরকারকেও পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার এক আকস্মিক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই চাঞ্চল্যকর ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চরম অস্থিরতা ও নতুন করে তীব্র সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এই নাটকীয় বরখাস্তের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে এক কড়া ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছিলেন ওসমান সোনকো। তিনি অভিযোগ তুলেছিলেন যে, 'স্বৈরাচারী' পশ্চিমা দেশগুলো বিভিন্ন রাষ্ট্রের ওপর সমকামিতাকে জোরপূর্বক 'চাপিয়ে দেওয়ার' অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কাকতালীয়ভাবে, সেনেগালে সমকামিতাসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি আরও কঠোর করতে সম্প্রতি একটি নতুন বিলও পাস করা হয়েছে। এই স্পর্শকাতর মন্তব্য করার পরপরই তাকে বরখাস্ত করার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে নানা জল্পনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
পশ্চিমাদের কড়া সমালোচনা করে ওসমান সোনকো বলেছিলেন, ‘তারা যদি এই পথ (সমকামিতা) বেছে নিয়ে থাকে, তবে সেটা তাদের সমস্যা। এ বিষয়ে তাদের কাছ থেকে আমাদের কোনো শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন নেই, একদমই না।’
আইনটি পাসের পর তিনি বিশেষ করে ফ্রান্সের কাছ থেকে তীব্র সমালোচনা শুনেছেন বলেও উল্লেখ করেন।
প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ওমর সাম্বা বা সরকারি টেলিভিশনে রাষ্ট্রীয় এই ডিক্রি বা অধ্যাদেশটি পড়ে শোনান। তিনি ঘোষণা করেন, ‘প্রেসিডেন্ট ফায়ে ওসমান সোনকোকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে সরকারে থাকা মন্ত্রীদেরও দায়িত্ব শেষ হয়েছে।’
তবে সোনকোর স্থলাভিষিক্ত কে হচ্ছেন বা নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কার নাম আসছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করা হয়নি।
পদ হারানোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী সোনকো লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। আজ রাতে আমি কুয়ের গরগুইয়ে শান্তিতে ঘুমাব।’
উল্লেখ্য, কুয়ের গরগুই রাজধানী ডাকারে অবস্থিত সোনকোর নিজস্ব এলাকা। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির সাংবাদিকেরা জানান, মধ্যরাতের পর সোনকো যখন নিজের বাসভবনে পৌঁছান, তখন সেখানে তাকে স্বাগত জানাতে শত শত সমর্থক জড়ো হন।
রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, প্রেসিডেন্ট ফায়ে মূলত এই ওসমান সোনকোর শক্তিশালী সমর্থনের ওপর ভর করেই রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ করেছিলেন। বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সোনকোরই দেশের শীর্ষ পদে বসার সবচেয়ে উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু একটি মানহানির মামলায় আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা হারান।
যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সংকটের সময় সোনকো নিজে সরে দাঁড়িয়ে ফায়েকে পূর্ণ সমর্থন দেন এবং ভোটারদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আমার চেয়েও ফায়ে বেশি নীতিবান। তাঁকে ভোট দেওয়ার অর্থ, আমাকে ভোট দেওয়া।’
এক সময় যে সোনকো ছিলেন ফায়ের রাজনৈতিক গুরু ও পথপ্রদর্শক, সাম্প্রতিক মাসগুলোয় তাদের সেই গভীর সম্পর্কে চরম তিক্ততা ও ফাটল দেখা দেয়।
ওসমান সোনকো ও বাসিরু দিওমায়ে ফায়ে দুজনে মিলে যৌথভাবে সেনেগালে ‘পাস্তেফ পার্টি’ নামক রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে দুর্নীতি দূরীকরণ এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনের জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা প্রথম দফার ভোটেই বিশাল জয় ছিনিয়ে নেন। বিশেষ করে সেনেগালের তরুণ সমাজের মধ্যে সোনকোর একচেটিয়া জনপ্রিয়তা ছিল। তাঁর প্যান-আফ্রিকান জাতীয়তাবাদী আদর্শ এবং সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান আফ্রিকান তরুণদের দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
জনপ্রিয়তায় সোনকো মাঠপর্যায়ে এগিয়ে থাকলেও, সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে সব চূড়ান্ত ক্ষমতা ফায়ের হাতেই ন্যস্ত ছিল। দেশের আইন অনুযায়ী, তিনি একটি সাধারণ অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমেই প্রধানমন্ত্রীকে পদচ্যুত করার ক্ষমতা রাখেন।
আসলে প্রেসিডেন্ট বাসিরু দিওমায়ে ফায়ে ও প্রধানমন্ত্রী ওসমান সোনকোর মধ্যকার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব গত কয়েক মাস ধরেই প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছিল, যা প্রশাসনের অন্দরে এক ধরনের অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে। গত মে মাসের শুরুতে দেওয়া এক দূরদর্শন বা টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ফায়ে নিজের অসন্তোষের কথা প্রকাশ্যে আনেন। সে সময় তিনি ক্ষমতাসীন দলের ভেতরে সোনকোর একক আধিপত্য ও প্রভাব খাটানোর চেষ্টার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
সেদিনের সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট বাসিরু দিওমায়ে ফায়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে বলেছিলেন যে, তাঁর আস্থা থাকা পর্যন্তই ওসমান সোনকো প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকবেন। আস্থা হারালে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান। অপরদিকে, বিরোধীদের লাগাতার আক্রমণ থেকে তাকে রাজনৈতিক সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় প্রেসিডেন্ট ফায়ের নেতৃত্ব ও যোগ্যতা নিয়েও পাল্টা প্রশ্ন তুলেছিলেন গুরু ওসমান সোনকো। শেষ পর্যন্ত সেই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ের অবসান ঘটল প্রধানমন্ত্রীর নাটকীয় বিদায়ের মধ্য দিয়ে।