
ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় অপরাধ সাম্রাজ্য পুনর্দখলে মারমুখী হয়ে উঠেছে পেশাদার কিলার ও সুপারি কিলার চক্রগুলো। সাম্প্রতিক বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর ঘটনার অনুসন্ধানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এমন উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। বর্তমানে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণে মাঠে কাজ করছে অর্ধশতাধিক পেশাদার ‘শুটার’ বা ‘কিলার’। হত্যা ও চাঁদাবাজির মতো মিশন বাস্তবায়নে তাদের এই তৎপরতায় দিন দিন রক্তাক্ত হচ্ছে পথঘাট, এমনকি অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রাণ হারাচ্ছে সন্ত্রাসীরা নিজেরাও। সম্প্রতি সরকারের পুরস্কারঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় থাকা খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন নিজের দলেরই কোন্দলের জেরে প্রাণ হারান।
গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, "সন্ত্রাসীদের কোনো দল নেই। আমাদের অভিযান অব্যহত রয়েছে।"
সম্প্রতি মিরপুর-১৩ নম্বর এলাকায় ইউসুফ আলী নামের এক যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে চুক্তিভিত্তিক হত্যাকাণ্ডের অকাট্য তথ্য পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গোয়েন্দা তদন্তে বেরিয়ে আসে, এক রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২৫ লাখ টাকার সুপারি দেওয়া হয়েছিল। এই কিলিং মিশন সম্পন্ন করতে ঝিনাইদহ ও মাগুরা সীমান্ত এলাকা থেকে ভাড়া করে আনা হয় চার জন পেশাদার শুটারকে। মূল টার্গেট রক্ষা পেলেও বন্দুকধারীদের গুলিতে অকালেই ঝরে যান ইউসুফ। এই কিলিং মিশনে জড়িত শুটারসহ আট আসামিকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে ডিবি।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর পুরো অপরাধজগৎ এখন কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কিলার চক্রের হাতের মুঠোয়। জামিনে বেরিয়ে আসা কিংবা বিদেশে গা ঢাকা দেওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পেছন থেকে কলকাঠি নেড়ে এই শুটারদের নিয়ন্ত্রণ করছে। আধিপত্য বিস্তার, ফুটপাত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়, মাদকের কারবার এবং আসন্ন সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর নির্বাচনকে ঘিরে ঘনীভূত রাজনৈতিক বিরোধ থেকেই এসব প্রাণঘাতী হামলার জন্ম। গোয়েন্দাদের তথ্যমতে, এই মুহূর্তে অর্ধশতাধিক কিলার এসব হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিচ্ছে।
দুবাই, থাইল্যান্ড, ভারত ও সুইডেনে আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ফোনে ঢাকা শহরের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের হুমকিসূচক বার্তা পাঠিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা হাঁকাচ্ছে। কাঙ্ক্ষিত চাঁদা না পেলেই লেলিয়ে দেওয়া হচ্ছে পেশাদার খুনিদের। অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন থানা থেকে খোয়া যাওয়া অস্ত্রের একটি বিশাল চালান এখনো অপরাধীদের হাতে রয়ে গেছে বলে জানায় গোয়েন্দারা। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে আনুমানিক ১ হাজার ৩৭৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ৮৪৯ রাউন্ড গুলির খোঁজ এখনো মেলেনি। ভাড়াটে খুনিরা এসব আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে বলে ধারণা করছেন তদন্তকারীরা।
চলতি বছরের মে মাস থেকে পুলিশ ও যৌথ বাহিনীর শুরু করা চিরুনি অভিযানে সারা দেশ থেকে ৭৬টি পিস্তল, ৩০টি শুটার গান, ৩৩টি এলজি সহ অন্যান্য মারাত্মক অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। ডিএমপির হিসাব বলছে, চলতি বছরের গত ছয় মাসে ঢাকা মহানগরে ১২২টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর এক বড় অংশই সংঘটিত হয়েছে চুক্তিভিত্তিক শুটারদের প্রকাশ্যে কিংবা ওত পেতে করা হামলায়।
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী, ভাসানটেক, কাফরুল, বাড্ডা, সবুজবাগ এবং মোহাম্মদপুর এলাকায় এসব কিলারদের যাতায়াত ও তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। ভাড়াটে এসব খুনিদের হাতে রয়েছে ছোট ও ভারী উভয় ধরনের আধুনিক বিদেশি অস্ত্র। মালবাহী বিভিন্ন যানবাহনে করে সীমান্ত পার হয়ে ছোট অস্ত্রগুলো ঢাকায় পৌঁছাচ্ছে। কেবল ১৮ জুলাই থেকে ২৪ জুলাই—এই অল্প কয়দিনের ব্যবধানে রাজধানীতে ইউসুফ ছাড়া ভাসানটেকে কাউসার মোল্লা, সবুজবাগে ইব্রাহীম পলাশ এবং হাজারীবাগে সাগর আহমেদ নামের এক তরুণ নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। যার মধ্যে ইব্রাহীম পলাশের দুটো হাতের কবজিই কেটে আলাদা করে দেয় ঘাতকেরা।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতে, অপরাধীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। দলীয় পরিচয়ের তোয়াক্কা না করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, শুধু মামলার গতানুগতিক হিসাব দিয়ে রাজধানীর ভেতরের এই বিপজ্জনক আন্ডারওয়ার্ল্ডকে ঢেকে রাখা সম্ভব নয়। পেশাদার খুনিদের এই নতুন দৌরাত্ম্য রুখতে ঢাকার প্রবেশদ্বারগুলোতে তল্লাশি জোরদার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন তারা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ঢাকায় অপরাধে ব্যবহৃত মোট অস্ত্রের প্রায় ৮০ শতাংশই সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ করে। আন্তর্জাতিক অস্ত্র কারবারিরা বাংলাদেশের প্রধান ১৭ থেকে ৩০টি রুট ব্যবহার করে অস্ত্র পাচার করে থাকে। কিলারদের ব্যবহৃত ছোট আগ্নেয়াস্ত্রগুলো মূলত যশোরের বেনাপোল, শার্শা, চৌগাছা এবং দর্শনা সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ভেতরে আসে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অরক্ষিত সীমান্ত এলাকাকে অস্ত্র চোরাচালানের প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা রাজশাহী ও নওগাঁ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশে। এছাড়া মিয়ানমার ও ভারতের মিজোরাম সীমান্ত ব্যবহার করে ভারী আগ্নেয়াস্ত্র, সাব-মেশিনগান এবং হ্যান্ড গ্রেনেড টেকনাফ ও উখিয়া পথ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।