
ঠাকুরগাঁওবাসীর কাছে এতদিনের পরিচিত ও প্রিয় ‘আলমগীর স্যার’ এবার ফিরছেন রাষ্ট্রপতি হিসেবে। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমবারের মতো নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরকে ঘিরে ইতোমধ্যে পুরো জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ। প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও উচ্ছ্বাস।
সরেজমিনে দেখা গেছে, রাষ্ট্রপতির সফর উপলক্ষে ঠাকুরগাঁও শহরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে চলছে সাজসজ্জা ও প্রস্তুতির কাজ। নির্মাণ করা হচ্ছে তোরণ, চলছে আলোকসজ্জা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং নাগরিক কমিটির সদস্যরাও প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও রাষ্ট্রপতিকে বরণ করে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তবে আনুষ্ঠানিক আয়োজনের বাইরেও সাধারণ মানুষের আগ্রহের জায়গাটি বেশ আবেগঘন। কারও কাছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ, কারও কাছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নেতা। আবার অনেকের কাছে তিনি নিজের শহরের সেই পরিচিত ‘আলমগীর স্যার’। রাষ্ট্রপতি হয়ে তার নিজ মাটিতে প্রত্যাবর্তন তাই ঠাকুরগাঁওবাসীর কাছে গর্ব, আনন্দ ও আবেগের এক বিশেষ মুহূর্ত।
জানা গেছে, সফরের প্রথম দিন রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টায় হেলিকপ্টারে ঠাকুরগাঁওয়ের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়বেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে ঠাকুরগাঁও মোহাম্মদ আলী স্টেডিয়াম মাঠে তার অবতরণের কথা রয়েছে। পরে তিনি জেলা সার্কিট হাউসে গিয়ে গার্ড অব অনার গ্রহণ করবেন।
এরপর রাষ্ট্রপতি শহরের সেনুয়া পাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে যাবেন। সেখানে সমাহিত তার বাবা সাবেক মন্ত্রী মরহুম মির্জা রুহুল আমীন (চোখামিয়া) ও মা ফাতেমা বেগমের কবর জিয়ারত করবেন তিনি।
কবর জিয়ারত শেষে কালীবাড়িতে নিজের বাসভবনে যাবেন রাষ্ট্রপতি। সেখানে দুপুরের খাবার ও বিশ্রাম শেষে বিকেলে ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ের বড় মাঠে নাগরিক কমিটির আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। এতে জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
সংবর্ধনা শেষে রাষ্ট্রপতি নিজ বাসভবনে ফিরে গণ্যমান্য ব্যক্তি, আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। সেখানেই তার রাতযাপনের কথা রয়েছে।
সফরের দ্বিতীয় দিন সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) সদর উপজেলার জামালপুর এলাকায় ঠাকুরগাঁও-পীরগঞ্জ সড়কের পাশে প্রস্তাবিত ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন রাষ্ট্রপতি।
ঠাকুরগাঁওয়ে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘদিনের। এ দাবিতে স্থানীয়রা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, সভা ও সমাবেশ করেছেন। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর জেলার সন্তান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হিসেবে স্থাপন করায় এটিকে সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন শেষে রাষ্ট্রপতি নিজ বাসভবনে ফিরে দুপুরের খাবার ও বিশ্রাম নেবেন। পরে সার্কিট হাউসে গিয়ে গার্ড অব অনার গ্রহণ করে হেলিকপ্টারে ঢাকার উদ্দেশে ঠাকুরগাঁও ছাড়ার কথা রয়েছে তার।
এদিকে রাষ্ট্রপতির সফরকে কেন্দ্র করে পুরো জেলায় জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ), প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্ট (পিজিআর) এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছেন। সফরের সম্ভাব্য স্থান, যাতায়াতের পথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা।
রাষ্ট্রপতির সংবর্ধনা কমিটির আহ্বায়ক ডা. আবু মো. খয়রুল কবির বলেন, ‘তিনি শুধু রাষ্ট্রপতি নন, তিনি আমাদের ঠাকুরগাঁওয়ের সন্তান। দীর্ঘদিন পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থেকে তিনি নিজের মানুষের কাছে ফিরছেন। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্ব ও আবেগের মুহূর্ত। আমরা চাই, ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে তাকে স্বাগত জানাক।’
জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে প্রথম আগমন জেলার মানুষের জন্য আনন্দ, গর্ব ও আবেগের বিষয়। ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে।’ রাষ্ট্রপতির সফরকে ঘিরে জেলার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, ‘৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতির দুই দিনের সফরকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সফরের প্রতিটি কর্মসূচি সুষ্ঠু, সুন্দর ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট দফতর, সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।’
ঠাকুরগাঁওয়ের এসপি মো. বেলাল হোসেন বলেন, ‘মহামান্য রাষ্ট্রপতির দুই দিনের সফরকে কেন্দ্র করে ঠাকুরগাঁওয়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সফরের প্রতিটি কর্মসূচি, যাতায়াতের পথ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোকে নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব এলাকায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তার সফরকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের চলাচল ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সব বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’
গত ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ২৫৫ ভোট পেয়ে জয়ী হন। তিনি জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) অলি আহমদকে পরাজিত করেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় সংসদ সদস্য, বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।