
দেশের বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিয়ে নতুন বিতর্কের মধ্যে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সচিবালয়ের অধীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৯ মে) সন্ধ্যায় এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।
এর মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা করার দীর্ঘদিনের দাবি ও সংস্কার প্রক্রিয়া আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠনের জন্য অধ্যাদেশ জারি হলেও সেটিকে পরে আর আইনে রূপ দেওয়া হয়নি।
সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রকে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হলেও স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। পরে নিম্ন আদালতের বিচারকদের বেতন কাঠামো ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অসন্তোষের জেরে ১৯৯৪ সালে বিচারপতি মাসদার হোসেনসহ ৪৪১ বিচারকের পক্ষে হাইকোর্টে রিট করা হয়।
সেই মামলার রায়ে ১৯৯৭ সালে হাইকোর্ট বিচার বিভাগকে স্বতন্ত্র কাঠামোয় পরিচালনার নির্দেশ দেন। পরে আপিল বিভাগের রায়েও বলা হয়, বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে না এবং বিচারকদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের হাতে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এর প্রায় আট বছর পর ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার বিভাগ পৃথক করার ঘোষণা দেয়। তবে বাস্তবে প্রশাসনিক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রণের বড় অংশ আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনেই থেকে যায়।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ গত বছর বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার প্রশ্নটি আবার সামনে আনেন। তিনি এক বক্তব্যে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ছাড়া বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে না।
পরে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনও পৃথক সচিবালয় গঠনের সুপারিশ করে। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদের কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক ও আর্থিকভাবে স্বাধীন বিচার বিভাগ গঠন জরুরি।
এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ৩০ নভেম্বর পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশ জারি করা হয়। তবে কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই কাঠামোই এখন বাতিল করা হলো। নতুন সিদ্ধান্তে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক স্বাধীনতা কতটা প্রভাবিত হবে, তা নিয়ে আইন অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে।