
রপ্তানি আয়ের ফোলানো-ফাঁপানো তথ্য প্রকাশ নিয়ে বিতর্কের দুই বছর পরও দেশের রপ্তানি পরিসংখ্যানে বড় ধরনের গরমিল রয়ে গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের পার্থক্য রয়েছে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৯৪০ কোটি ডলার। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে রপ্তানি আয় ৩ হাজার ৬০২ কোটি ডলার। ফলে দুই প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যানে ব্যবধান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৯০ কোটি ডলার।
এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মধ্যে ৪৩১ কোটি ডলারের পার্থক্য ছিল। তখন ইপিবি রপ্তানি আয় দেখিয়েছিল ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ডলার, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে আয় ছিল ৪ হাজার ৩৯৭ কোটি ডলার।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, এত কিছুর পরও ইপিবি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে কেন ব্যবধান হচ্ছে বুঝতে পারছি না। এটা মোটেও কাম্য নয়।
তিনি বলেন, সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলে নীতি নির্ধারণে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা ভবিষ্যতে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও রপ্তানি খাতের পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজও বিষয়টিকে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এখনও বড় ব্যবধান কেন থাকবে? এটা ঠিক করা দরকার। এতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কাছে বাংলাদেশের ইমেজ নষ্ট হয়।
তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যই তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরযোগ্য। তিনি বলেন,সামান্য ব্যবধান হতে পারে। কিন্তু ১০ মাসে ৪ বিলিয়ন ডলারের গরমিল কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
২০২৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমবারের মতো ইপিবির প্রকাশিত রপ্তানি তথ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দাবি ছিল, ইপিবির তথ্যে একই রপ্তানির হিসাব একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে রপ্তানি আয় বেশি দেখানো হয়েছে।
ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ অবশ্য দাবি করেছেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্দেশনা অনুসরণ করে এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করেই বর্তমানে রপ্তানি তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে ১০ মাসে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের ব্যবধানের বিষয়ে তিনি বলেন, এত পার্থক্য থাকার কথা নয়। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানও বলেছেন, বিষয়টি আগেই সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধান করা হয়েছিল। তারপরও কেন এত বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে খতিয়ে দেখা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, রপ্তানি আয়ের সঠিক পরিসংখ্যান নিশ্চিত করা না গেলে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, বৈদেশিক লেনদেনের হিসাব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।