
নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব থেকে সরে আসছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার পর ব্যাংকার, ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমালোচনার মুখে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেটে নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন সনদ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকছে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী রোববার (২৯ জুন) অর্থবিল পাসের সময় কর ও শুল্কসংক্রান্ত কয়েকটি সংশোধনী চূড়ান্ত করা হবে। এরপর সোমবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট পাস হওয়ার কথা রয়েছে। টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবের পাশাপাশি কাঁচা কাজুবাদাম আমদানির শুল্ক, বিজ্ঞাপনী সংস্থার উৎসে করসহ কয়েকটি সিদ্ধান্তেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। তবে বাজেটের আকার, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য অপরিবর্তিত থাকবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন যেকোনো ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছিল। যদিও শিক্ষার্থী, ১০ টাকার বিশেষ হিসাব, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী এবং পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রে ছাড় রাখার প্রস্তাব ছিল। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে করযোগ্য আয় না থাকলেও টিআইএনধারীদের নিয়মিত আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হতো। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সরকার এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায় না, যাতে মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় বা আনুষ্ঠানিক লেনদেনের পরিবর্তে নগদ ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ কারণেই টিআইএন বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনায় রাখা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী চীন সফর শেষে দেশে ফিরলে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ব্যাংক খাতের বর্তমান বাস্তবতায় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না, যাতে গ্রাহকদের মধ্যে অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। করজাল সম্প্রসারণ জরুরি, তবে সেটি বাস্তবসম্মত উপায়ে করতে হবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ১৯ কোটি ৩২ লাখ ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৭ কোটি ৮০ লাখ সঞ্চয়ী হিসাব এবং প্রায় দেড় কোটি ঋণ হিসাব। ব্যাংকারদের আশঙ্কা ছিল, টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে নিরুৎসাহিত হবেন। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
একটি গণমাধ্যমকে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘দেশের অনেক মানুষের এখনও টিআইএন নেই। টিআইএন খোলাও অনেকের কাছে সহজ বিষয় নয়। ফলে বাজেট ঘোষণার পর মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভয় তৈরি হয়েছে। এটি কার্যকর হলে অনেকেই ব্যাংক হিসাব না খুলে সমবায় বা অন্য বিকল্প ব্যবস্থায় চলে যেতে পারতেন।’ তবে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হলে ভবিষ্যতে এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যেতে পারে বলেও তিনি মত দেন।
সরকারের লক্ষ্য করদাতার সংখ্যা বাড়িয়ে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি করা হলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল ব্যাংক হিসাবধারীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। তারা বলছেন, অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিকে করের আওতায় আনার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
একটি গণমাধ্যমকে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, ‘সরকারের উচিত অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিকে করের আওতায় আনা। দেশে এখনো বিপুল পরিমাণ ব্যবসা ও লেনদেন ব্যাংকের বাইরে পরিচালিত হয়। সেই খাতগুলোকে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির আওতায় আনতে পারলেই রাজস্ব আহরণ টেকসইভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে।’
এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে খোসাসহ কাঁচা কাজুবাদাম আমদানির ওপর শুল্ক ও ভ্যাট বাড়ানোর সিদ্ধান্তেও পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেছে। দেশীয় প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কাঁচা কাজুবাদামের শুল্ক কমানো এবং প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের ওপর সুরক্ষামূলক শুল্ক বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে এনবিআর।
এ ছাড়া প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এজেন্সির বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে উৎসে কর শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ থেকে ৪ শতাংশ করার প্রস্তাবও পুনর্বিবেচনার আওতায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট খাতের আপত্তির পর এ হার কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেটে বড় ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ না থাকলেও কর ও শুল্কসংক্রান্ত কয়েকটি বিষয়ে বাস্তবতার আলোকে সীমিত সংশোধন আনা হবে। এর মধ্যে উৎসে করের কিছু হার পুনর্নির্ধারণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কর সুবিধা, নির্দিষ্ট আমদানিপণ্যের শুল্ক সমন্বয়, প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপের কর সুবিধা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের কিছু কর অবকাশ বহাল রাখার বিষয় রয়েছে।
একটি গণমাধ্যমকে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, ‘রাজস্ব আহরণ বাড়ানো জরুরি হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে তা করা উচিত নয়। ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।’
আরেকটি গণমাধ্যমকে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘করব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন বাড়াতে নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।’