
শিল্পের উৎপাদন ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা সচল রাখতে দীর্ঘমেয়াদি, পূর্বানুমানযোগ্য এবং সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা। একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চল ও রপ্তানিমুখী কারখানায় অগ্রাধিকার দিয়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আগাম লোডশেডিং সূচি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।
রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর গুলশানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব দাবি উঠে আসে।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ ও এমসিসিআই যৌথভাবে ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চ্যালেঞ্জ: উন্নত ব্যবসায়িক পরিবেশের জন্য নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ’ শীর্ষক বৈঠকটির আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করে অস্ট্রেলিয়া সরকারের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য বিভাগ।
বৈঠকের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন এমসিসিআইয়ের মহাসচিব ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ। পরে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট হাসিব হাসান ‘বিজনেস ইনফ্রাস্ট্রাকচার—পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি’ শিরোনামে একটি উপস্থাপনা দেন। সেখানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা, বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব এবং অঞ্চলভিত্তিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ বিজনেস ইনডেক্সের (বিবিএক্স) তথ্য তুলে ধরা হয়।
এরপর পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম. মাসরুর রিয়াজের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, লাফার্জহোলসিমের পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী, ইএসটেক্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. ইজাজ হোসেন এবং বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম।
আলোচনায় বিবিএক্স ২০২৪-২৫-এর তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, ব্যবসায়িক অবকাঠামোর স্কোর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৭১ দশমিক ১ পয়েন্ট থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৮ দশমিক ৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৪ দশমিক ২ শতাংশ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, তারা কখনো কখনো বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মুখে পড়েন। অন্যদিকে মাত্র ২০ দশমিক ১ শতাংশ ব্যবসায়ী অবকাঠামো উন্নয়নে কাঠামোগত বা নিয়ন্ত্রক উদ্যোগের বাস্তবতা দেখেছেন।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, চলমান গ্যাস সংকট, কম গ্যাসের চাপ, জ্বালানি সংকট, বিদ্যুতের ঘাটতি এবং জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আগস্টের শুরুতে দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়। পাশাপাশি গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানাকে উৎপাদন কমাতে কিংবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, বর্তমান জ্বালানি সংকট দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং জ্বালানি সংগ্রহ ব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। রপ্তানিমুখী ও জ্বালানি-নির্ভর শিল্পকে সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি পৃথক শিল্প জ্বালানি নীতি প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে।
মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, বিদ্যমান শিল্প বিনিয়োগ রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনা জরুরি। আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও টেকসই উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে জ্বালানি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
সিরামিক শিল্পে গ্যাসের গুরুত্ব তুলে ধরে মইনুল ইসলাম বলেন, এ খাতে গ্যাস শুধু জ্বালানি হিসেবে নয়, উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘদিনের সরবরাহ অনিশ্চয়তা শিল্পটির উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও নতুন বিনিয়োগকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
ইজাজ হোসেনের মতে, জ্বালানি সংকট এখন আর কেবল সরবরাহের সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি ও পরিকল্পনার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাস্তবসম্মত জ্বালানি মিশ্রণের বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে।
আলোচনায় শিল্প ও রপ্তানিমুখী কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি আগাম ও নির্ভরযোগ্য লোডশেডিং সূচি প্রকাশের দাবি জানানো হয়। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, এমন সূচি থাকলে কারখানাগুলো আগেভাগেই উৎপাদন পরিকল্পনা করতে পারবে।
গোলটেবিল বৈঠকের সুপারিশের আলোকে বিবিএক্সের তথ্য এবং তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার প্রস্তাব সমন্বয় করে একটি নীতিপত্র তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়।