মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে—কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি ঘিরে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের পথে হাঁটতে যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে, ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো প্রথম পারস্য উপসাগরীয় দেশ হবে আমিরাত। ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করতে বলপ্রয়োগের অনুমোদন পেতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি প্রস্তাব পাশ করানোর জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে আবুধাবি।
বৃহস্পতিবার (২ মার্চ) এই প্রস্তাবের ওপর ভোট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা স্পন্সর করছে বাহরাইন।
সামরিক পরিকল্পনা ও দ্বীপ নিয়ে উত্তেজনা
আমিরাতের কর্মকর্তাদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের পাতা মাইন অপসারণসহ বিভিন্ন সামরিক সহায়তায় তারা সক্রিয় ভূমিকা নিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে প্রণালিতে অবস্থিত ‘আবু মুসা’ দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে দেশটি। দ্বীপটি বর্তমানে ইরানের দখলে থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে এর মালিকানা দাবি করে আসছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।
আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখার বিষয়ে একটি বৈশ্বিক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।’
ইরানিদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা
সংঘাত তীব্রতর হওয়ায় ইরানি নাগরিকদের জন্য সীমান্ত নীতিও কঠোর করেছে আমিরাত। বুধবার (১ মার্চ) এমিরেটস, ইতিহাদ এবং ফ্লাইদুবাই ঘোষণা দিয়েছে, গোল্ডেন ভিসাধারী ছাড়া অন্য কোনো ইরানি নাগরিক এখন আমিরাতে প্রবেশ বা ট্রানজিট সুবিধা পাবেন না। পাশাপাশি দুবাইয়ে অবস্থিত ‘ইরানীয় হাসপাতাল’ ও ‘ইরানীয় ক্লাব’ও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থান
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তেহরানকে মোকাবিলায় তিনি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে একটি ‘নতুন জোট’ গঠনের চেষ্টা করছেন। তার দাবি, বেশ কয়েকটি আরব দেশ এখন ইসরাইলের পাশে থেকে যুদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
অন্যদিকে সৌদি আরবও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান গত ১৯ মার্চ ইরানকে সতর্ক করে বলেন, সৌদি আরবের সামরিক শক্তি যথেষ্ট সক্ষম এবং প্রয়োজনে তা ব্যবহারে তারা পিছপা হবে না। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালে ইরানের সঙ্গে পুনঃস্থাপিত কূটনৈতিক সম্পর্কের যে আস্থা ছিল, তা এখন সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে।
বিশ্ববাজারে প্রভাব ও বিশ্লেষণ
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। এই পথ অবরুদ্ধ হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো খাদ্য আমদানিতেও চাপের মুখে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দুবাই ইরানের অর্থনৈতিক লেনদেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলেও বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেই সম্পর্কেও বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন না হওয়া পর্যন্ত সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।